সুদীপনারায়ণ ঘোষ

২৬ নভেম্বর পেরিয়ে গেল ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের আর একটি জন্মদিন। তিনি হাওড়া জেলার শিবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। মতিলাল শীল’স ফ্রি স্কুলে তিনি পডাশোনা করেন। ১৯০৭ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেন। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে এফএ (প্রি-ইউনিভার্সিটি পরীক্ষা) পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান লাভ করেন। ১৯১১ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মেজর (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ১৯১৩ সালে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ-তে প্রথম হন। একই বছর তিনি কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজির লেকচারার হিসাবে নিযুক্ত হন। সেখানে তাঁর সহকর্মী ছিলেন নাট্যকার শিশিরকুমার ভাদুড়ি।
ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় The Origin and Development of the Bengali Language নামে ইংরেজিতে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যা ODBL নামেই বেশি পরিচিত। এটা বাংলা ভাষাসংক্রান্ত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ বিষয়ে যে মৌলিক গবেষণার জন্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন, তার ওপর ভিত্তি করেই এই গ্রন্থ প্রণীত এবং ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর থেকেই এটা ভারতীয় ও ইউরোপীয় পণ্ডিত সমাজের উচ্চ প্রশংসা ও অনুমোদন লাভ করে আসছে। এখনও ইন্দো-আর্য ভাষার বিজ্ঞানসম্মত পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে এটা বিশিষ্ট গবেষণা কর্মরূপে বিবেচিত হয়।
সুবৃহৎ এই গ্রন্থের প্রধানত দুটি অংশ— Part-I: Introduction (ভূমিকা), Phonology (ধ্বনিতত্ত্ব) এবং Part-II: Morphology (গঠনতন্ত্র), Bengali Index. এর পরবর্তী সংস্করণে (১৯৭১) সংযোজিত হয় Part-III: Supplementary (পরিপূরক), Additions (সংযোজন), Correction (সংশোধন) etc. বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশের স্বরূপ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে এই গ্রন্থে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বাংলা ভাষার প্রকৃতি তথা ধ্বনি (বর্ণ ও ছন্দ), রূপমূল (শব্দ) ও ব্যাকরণগত ধারাসমূহ উপস্থাপনে সুনীতিকুমার যে কৌশল অবলম্বন করেছেন, তা একইসঙ্গে বর্ণনামূলক ও তুলনামূলক। বাংলা ভাষার উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে ভারতীয় মূল সব ভাষা-সহ ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার প্রধান যেসব ভাষার পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে, সেগুলিরও বিস্তারিত বর্ণনা আছে এই গ্রন্থে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বিশেষত বাংলা ভাষাতত্ত্বের ছাত্র-শিক্ষক-গবেষকদের কাছে গ্রন্থটি অবশ্যপাঠ্য হিসাবে বিবেচিত। এই গ্রন্থের তুল্য আর কোনও গ্রন্থ পৃথিবীতে নেই। কারণ এই গ্রন্থে বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশের বিশ্লেষণ করতে যে পদ্ধতি তিনি ব্যবহার করেছিলেন, তা পৃথিবীর যে কোনও ভাষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
