কাজল মুখার্জি

সুনীতা লিন উইলিয়ামস শুধু একজন মহাকাশচারী নন, তিনি মহাকাশ গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণের প্রতীক। তাঁর সংগ্রাম, নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণা। তাঁর মহাকাশ অভিযানের ইতিহাস প্রমাণ করেছে, সীমানা কেবল মানসিকতার মধ্যে থাকে, প্রকৃতপক্ষে স্বপ্ন এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে মানুষ মহাকাশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
সুনীতা জন্মগ্রহণ করেন ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সালে আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ইউক্লিড শহরে। তাঁর বাবা দীপক পাণ্ড্য ভারতীয় বংশোদ্ভূত, যিনি একজন চিকিৎসক ছিলেন এবং গুজরাটের ঝুলাসন গ্রামের বাসিন্দা। মা বনি পাণ্ড্য ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত, যিনি স্লোভেনিয়ার নাগরিক ছিলেন। শৈশব ও কৈশোরে সুনীতা বেশ ক্রীড়াপ্রেমী ছিলেন, বিশেষত সাঁতার, দৌড় ও অন্যান্য শারীরিক কসরতে পারদর্শী ছিলেন।
সুনীতা নটরডাম অ্যাকাডেমি থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) থেকে ভার্জিনিয়া মিলিটারি ইনস্টিটিউট হয়ে ১৯৮৭ সালে প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর তিনি মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেন এবং পাইলট হিসাবে প্রশিক্ষণ নেন।
সুনীতা উইলিয়ামস নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার পাইলট হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মিশনে অংশ নেন। তাঁর অসাধারণ দক্ষতার কারণে তাঁকে নাসার মহাকাশচারী কর্মসূচিতে মনোনীত করা হয়। ১৯৯৮ সালে তিনি নাসার মহাকাশচারী হিসাবে প্রশিক্ষণ শুরু করেন এবং খুব দ্রুত তাঁর দক্ষতা ও মেধার জন্য স্বীকৃতি পান।
২০০৬ সালে সুনীতা উইলিয়ামস প্রথমবারের মতো মহাকাশ ভ্রমণে যান ‘এক্সপিডিশন ১৪’ ও ‘এক্সপিডিশন ১৫’ মিশনের সদস্য হিসাবে। ওই অভিযানে তিনি ১৯৫ দিন মহাকাশে কাটান, যা তখনকার সময়ের মধ্যে একজন নারীর জন্য সর্বোচ্চ মহাকাশে থাকার রেকর্ড ছিল। ওই মিশনে তিনি ৪টি মহাকাশ ভ্রমণ (spacewalk) সম্পন্ন করেন, যা মোট ২৯ ঘণ্টা ১৭ মিনিট স্থায়ী হয়। তাঁর এই সাফল্য নাসার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে।
২০১২ সালে সুনীতা ‘এক্সপিডিশন ৩২’ ও ‘এক্সপিডিশন ৩৩’ মিশনের জন্য ফের মহাকাশে যান। ওই মিশনে তিনি কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ন’টি মহাকাশ ভ্রমণ সম্পন্ন করেন, যার মোট সময় ছিল ৬২ ঘণ্টা ৬ মিনিট, যা মহাকাশে চলার ক্ষেত্রে নারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। ওই অভিযানে তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (ISS) রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন এবং সেখানে বসবাসকারী মহাকাশচারীদের জন্য বেশ কয়েকটি গবেষণা পরিচালনা করেন।
সুনীতা উইলিয়ামস ২০২৪ সালে বোয়িং এবং নাসার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘বোয়িং ক্রু ফ্লাইট টেস্ট’ মিশনে মনোনীত হন। এটি বোয়িং কোম্পানির স্টারলাইনার ক্যাপসুলের প্রথম মনুষ্যবাহী মিশন। এই মিশনে তিনি ২৮৬ দিন মহাকাশে কাটান, যা তাঁর জীবনের অন্যতম দীর্ঘ মহাকাশ অভিযান। ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসেন, যা মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সুনীতা উইলিয়ামসের স্বামী মাইকেল জে উইলিয়ামস একজন ফেডারেল মার্শাল (US Marshal)। তাঁদের বিবাহিত জীবন দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী। সুনীতার ধর্মীয় বিশ্বাসও বেশ আকর্ষণীয়। তিনি একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং মহাকাশে থাকাকালীন তিনি শ্রীমদ্ভগবদগীতা ও ভগবান গণেশের একটি ছোট মূর্তি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই ধর্মীয় উপকরণগুলি তাঁকে মানসিক স্থিরতা ও শান্তি দিতে সহায়তা করেছে।
সুনীতা উইলিয়ামস তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য,
নাসার অসামান্য সেবা পদক
নৌবাহিনীর পদক (Legion of Merit)
সোভিয়েত মহাকাশ সংস্থার বিশেষ সম্মাননা
ভারত সরকারের ‘পদ্মভূষণ’ সম্মান (২০২০ সালে প্রস্তাবিত)।
