Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

গণমানুষের কবি সুকান্ত

Share Links:

সুদীপ ঘোষাল

মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন। মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তিনি তাঁর অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বাল্যশিক্ষা শুরু হয় কলকাতার কমলা বিদ্যামন্দিরে| এখানেই তাঁর লেখা প্রথম ছোটগল্প প্রকাশিত হয় স্কুলেরই নিজেস্ব পত্রিকা ‘সঞ্চয়’-এ | এ স্কুলে তিনি বেশ কয়েক বছর পড়াশোনা করেন এবং তারপর ভর্তি হন বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে| তারপর ১৯৪৫ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ফেল করেন| বাড়িতে তাঁর বাবা বললেন, ‘ফেল করেছিস তো, কী হয়েছে! মনে রাখবি, এটা সাফল্যের একটি স্তম্ভ।

সুকান্ত বললেন, ‘আমার স্কুলে যেতে লজ্জা করছে।’ তাঁর বাবা বললেন, ‘স্কুলে তুমি যাও। এবার দেখো, তুমি পাশ করবে।’

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই কবি সুকান্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন| সে সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য তাঁর পড়াশোনার পরিসমাপ্তি ঘটে। ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন,  সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, অনৈতিক ব্রিটিশ শাসন প্রভৃতির বিরুদ্ধে তিনি ও তাঁর দল ভীষণভাবে সোচ্চার হয়| তিনি তাঁর সীমিত জীবনকালে যা কিছু সাহিত্য সৃষ্টি করে গিয়েছেন, তা সত্যিই অনবদ্য| তিনি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সে সময় কলম ধরেছিলেন| তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্ম আজও প্রত্যেক বাঙালি পাঠককে মাতিয়ে রাখে।

কবি সুকান্ত তাঁর বন্ধুদের বলতেন, ‘আমার যেমন পার্টির কাজ, অন্যদিকে তেমন সাহিত্যকর্ম, অভাব ও অনটন। এ সবকিছুর ধকল আমার শীর্ণ শরীর আর মানতে পারছে না।’ বন্ধুরা তাঁকে সাহায্য করতেন অর্থ দিয়ে। তাঁরা বলতেন, ‘শরীরের যত্ন নে। তা না হলে তোর বিপদ হবে।’

তবুও কবি লিখে যেতেন কষ্ট করে। অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে নিজের শরীরের ওপর যে অত্যাচার তিনি করেন, তাতে তাঁর শরীরে প্রথমে ম্যালেরিয়া এবং পরে দুরারোগ্য যক্ষারোগ হানা দেয়| বন্ধুরা তাঁকে দেখতে আসতেন আর সাবধানবাণী শোনাতেন। কবি মুচকি হেসে বলতেন, ‘দেখবি, একদিন পালিয়ে যাব ফাঁকি দিয়ে। এই ম্যালেরিয়া আর যক্ষার আদরে আমি জর্জরিত।’

এক কবিসভায় কোনও এক কবিবন্ধু তাঁকে পালকি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে সভায় বন্ধুটি কবির সম্বন্ধে দু’-চার কথা লিখেছিলেন। কবির সামনেই সে লেখা পাঠ করেছিলেন। তিনি সভায় উপস্থিত সকলের উদ্দেশে বলেন, ‘আট-ন’বছর বয়স থেকেই সুকান্ত লিখতে শুরু করেন। তিনি আমার বন্ধুসম। তাঁর কাছেই শোনা কথাগুলি আমি বর্ণনা করছি।’

কবি তো প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি বললেন, ‘আমাকে আগে এ কথা বললে না! আমার সামনে আমারই স্তুতি নিবেদন করবে তুমি! এ যে ভীষণ লজ্জার।’

বন্ধু বলেছিলেন, ‘আগে বললে উনি তো অনুমতি দিতেন না। আমাকে ক্ষমা করো।’

সমবেত সকলে হাততালি দিয়ে জয়ধ্বনি করলেন। তারপর কবির বন্ধু বলতে শুরু করলেন, ‘আমি আমার বন্ধুর সাহিত্যকর্মের বিষয়ে কয়েকটি সংবাদ পরিবেশন করব। তিনি স্কুলের হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়’-এ একটি ছোট্ট হাসির গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ করেন। তার দিনকয়েক পরে বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘শিখা’ কাগজে প্রথম ছাপার মুখ দেখে তাঁর লেখা বিবেকানন্দের জীবনী। মাত্র ১১ বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামে একটি গীতিনাট্য রচনা করেন। এটি পরে তাঁর ‘হরতাল’ বইয়ে সংকলিত হয়। বলে রাখা ভালো, পাঠশালায় পড়া কালেই ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সুকান্ত। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাল্যবন্ধু লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে যৌথভাবে আর একটি হাতে লেখা কাগজ ‘সপ্তমিকা’ সম্পাদনা করেন। অরুণাচল তাঁর আমৃত্যু বন্ধু ছিলেন। মার্কসবাদী চেতনায় আস্থাশীল কবি হিসাবে সুকান্ত কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান করে নেন। সুকান্তকে বলা হয় গণমানুষের কবি। অসহায়, নিপীড়িত, সর্বহারা মানুষের সুখ-দুঃখ তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী, মহাজন, অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়। যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তাঁর কবিতার নিপুণ কর্মে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণিবৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা, অর্থাভাব তাঁকে কখনও দমিয়ে রাখতে পারেনি।

সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা দৈনিক স্বাধীনতার (১৯৪৫) ‘কিশোরসভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। তাঁর কবিতায় অনাচার ও বৈষ্যমের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ উঠে আসে। গণমানুষের প্রতি গভীর মমতাই প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল, ছাড়পত্র (১৯৪৭), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠেকড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), ঘুম নেই (১৯৫৪), হরতাল (১৯৬২), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫) প্রভৃতি। পরবর্তী কালে উভয় বাংলা থেকে সুকান্ত সমগ্র নামে তাঁর রচনাবলি প্রকাশিত হয়। সুকান্ত ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে ‘আকাল’ (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। তাঁর কবিতা বিষয় বৈচিত্রে অনন্য। সাধারণ বস্তুকেও তিনি কবিতার বিষয় করেছেন। বাড়ির রেলিং ভাঙা সিঁড়ি উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। সুকান্তের কবিতা সব ধরনের বাধাবিপত্তিকে জয় করতে শেখায়। যাপিত জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণাকে মোকাবিলা করার সাহস তাঁর কবিতা থেকে পাওয়া যায়। তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান তাঁর কবিতায় লক্ষণীয় বিষয়। সুকান্তের কবিতা মানুষকে সাহসী ও উদ্দীপ্ত করে। তাঁর সাম্যবাদী রচনা মানুষকে জীবনের সন্ধান দেয়। স্বল্প সময়ের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশ-সহ সে সময়ের বড় বড় কবির ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাননি। নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন প্রতিভা, মেধা ও মননে। সুকান্ত তাঁর বয়সের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছেন পরিণত ভাবনায়। সে ক্ষেত্রে সুকান্ত তাঁর বয়সের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए