কাজল মুখার্জি

‘আমি মরছি গলার ব্যথায়, আর শালারা বলে ভগবান!’ মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে নিজেকে নিয়ে এমন রসিকতা করতে পারেন শ্রীরামকৃষ্ণই। অন্যকে নিয়ে রসিকতা করার মধ্যে লুকিয়ে থাকে অহংকার। প্রত্যক্ষ বা গোপন। কিন্তু নিজেকে নিয়ে? রসিকতার উচ্চতম পর্যায়েই এটা সম্ভব।
নিজের হত্যাকারী ব্যাধকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। পচা মাংস খেয়ে মৃত্যুর আগে সেই ভক্তকে আশীর্বাদ করেছিলেন বুদ্ধদেব। করুণায় ভরা ছিল তাঁর মন। মৃত্যুর আগে হত্যাকারীদের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন জিশু খ্রিস্ট। আর শ্রীরামকৃষ্ণ হাসছেন। মজা করছেন নিজেকে নিয়ে। ধর্মের ইতিহাসে এ বড় আশ্চর্য! সারাটা জীবনই তাঁর আনন্দের মহাযজ্ঞ। এমন মানুষকে দূর থেকে পুজো নয়, সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়া যায়। এমন কথাই বলেছেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করে এসে অন্যদের কাছে মন্তব্য করেছেন, ‘ওরে বাপরে, কার কাছে গেছলাম! কথা বলার সময় মনে হত, যেন এক ক্লাসে পড়ছি!’
কবি আনন্দ বাগচি লিখেছেন, ‘শ্রীরামকৃষ্ণ আমাদের কাছে অনেক বেশি জীবন্ত, অনেক বেশি কাছের মানুষ, অন্তরঙ্গ।’ শ্রীরামকৃষ্ণকে অন্তরের বন্ধু হিসাবে চিনেছিলেন লাহোরবাসী ডা. মহম্মদ দাউদ রাবার। আমেরিকা, কানাডা, তুরস্কের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা মস্কোর গবেষক ডা. বি রিবাকভের মতে, ‘তিনি সাধারণ মানুষের। আবার সাধারণ মানুষ হয়েও তিনি অসাধারণ।’
প্রমথনাথ বিশীর স্বীকারোক্তি, ‘আমরা গুরু বলতে বুঝি ২৪ ঘণ্টার গুরুমশাই। আর আমার এই ঠাকুর ২৪ ঘণ্টার আপনজন।’
মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ হাসছেন। অবশ্য আগেও তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন। সাধনার সময়। মন্দিরে দাঁড়িয়ে মা কালীর হাত থেকে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন প্রাণ বিসর্জনের জন্য।
মৃত্যু তো একটি প্রতীক মাত্র। বিরাট পরিবর্তনের প্রতীক। এমন পরিবর্তন আমাদের সত্তাকে নাড়া দিয়ে যায়। আমরা কেঁপে উঠি। পরিবর্তনকে বিপদ বলে মনে করি। অথচ জীবন তো পরিবর্তনের স্রোত। ছোট-বড় অসংখ্য পরিবর্তন নিয়েই জীবন। ছাঁচে ঢালা পরিবর্তনকে মানুষ মেনে নেয়। স্কুল থেকে কলেজে যাওয়া, চাকরি নেওয়া, বিয়ে করা, ভিনরাজ্যে বদলি, নির্বাচনে নতুন সরকার আসা, পিকনিকে যাওয়া, নতুন গেজেট প্রভৃতি। এসব ঠিক আছে। কিন্তু বেমক্কা পরিবর্তন আসা, যা নিয়ে ভাবিনি, যা আমাদের দৈনন্দিন ছন্দপতন করে, যা চাইনি, সেক্ষেত্রে? যেমন, স্ত্রীর হাসপাতালে যাওয়া, অফিসে প্রোমোশন না পাওয়া, পরীক্ষায় সন্তানের রেজাল্ট খারাপ, সুন্দরবনে বদলি, প্রিয়জনের মৃত্যু, পাড়ার মস্তানের দাদাগিরি। আমরা ভয় পেয়ে যাই, এড়াতে চাই, হাত দিয়ে মুখ ঢাকি। মনের গভীরে স্থিতাবস্থা চাই। আমরা চাই নিজস্ব বৃত্তেই ঘোরাফেরা করতে। আর এভাবেই জীবন হয়ে ওঠে ‘কলুর বলদ’। গড্ডলিকা প্রবাহ, দিনগত পাপক্ষয়।
ধর্মীয় সাধনা উত্তরণের। জীবনকে মহাজীবন করে তোলার যাত্রা। শ্রীরামকৃষ্ণ তারই হদিশ দিয়েছেন। তিনি তো গুরুমশাই নন। আমাদের কাঁধে হাত রেখে আপনজন হয়ে এসেছেন। আমাদের এই আটপৌরে জীবন, বাস আর লোকাল ট্রেনে ধাক্কা খেতে খেতে যাওয়া জীবন, জিন্দাবাদের জীবন, দাম বেড়ে যাওয়া আলু, তেল খাওয়া জীবন, মেয়ের বিয়ে আর ছেলের চাকরির অপেক্ষায় থাকা জীবনকে মহাজীবন করে তোলাই শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্ম।
তথ্যসূত্র: ‘শ্রীরামকৃষ্ণ ও আজকের জিজ্ঞাসা’— স্বামী সোমেশ্বরানন্দ
