সনৎ ঘোষ

চড়ুই ও ঘুলঘুলি একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রসঙ্গত মনে পড়ে যাচ্ছে চড়ুই ও বাবুইয়ের সেই কথোপকথনের ছড়া, যেখানে একে অন্যকে বেঁচে থাকার অনুভূতি প্রকাশ করছে। সেখানে তাদের বাসা বুনন ও আত্মমর্যাদাবোধকে তুলে ধরা হয়েছে।
শিল্পী পাখি বাবুইয়ের বাসার বিষয়ে কমবেশি সকলেরই জানা। আর ছোট্ট পাখি চড়ুই এখন কেমন আছে? আজও কি তারা বাসা বাঁধে ঘুলঘুলিতে, নাকি হারিয়ে গিয়েছে? বর্তমানের বহুতল বা পাকাবাড়ির ঘুলঘুলি এখন কংক্রিটের দেওয়ালে ঢাকা। সেখানে কোনওমতে হাওয়া ঢুকতে পারলেও চড়ুই ঢুকতে পারে না। তাই সেখানে চড়ুইয়ের বাসা বাঁধা আর হল কই! অথচ তারা বাসা বাঁধত সেই ঘুলঘুলিতেই। দালানে চিলেকোঠার ফাঁকফোকরে খড়কুটো দিয়ে তৈরি হত তাদের বাসা। ঘুলঘুলিতে ঢোকা, বের হওয়া, তাদের কিচিরমিচির শব্দে ভরে উঠত দালানঘর। তাদের প্রয়োজনীয় খাবারও মিলত সেই ঘরে। চাল, ডাল, গম ইত্যাদি দানাশস্য সহজলভ্য ছিল, ফলে খাবার ও বাসস্থান মিলে যেত একছাদের তলায়। আবার এই চড়ুই-ই হয়ে উঠত ছোটদের খেলার সঙ্গী। মানুষের সঙ্গে থাকতে থাকতে ভয়টাই চলে যেত তাদের। গায়ের কাছাকাছি উড়ে বেড়াত। ছোটরা ধরতে চাইলে ফুড়ুৎ করে উড়ে বসত রেলিংয়ে, নয়তো ঢুকে যেত অন্য দেওয়ালের ঘুলঘুলিতে। ছোটদের সঙ্গে ওরাও মজা পেত লুকোচুরি খেলায়। ওদের ঘরের মধ্যেই যত ওড়াউড়ি। সেটাই তাদের জগৎ। চড়ুইয়ের তখন আর গাছগাছালিতে থাকার প্রয়োজন পড়ত না, হয়ে উঠত একপর্যায়ে পোষা পাখি।
আবার দুর্ঘটনায় যে ঘটত না, এমন নয়। ঘরের ভিতরে উড়তে উড়তে অনেক সময় সিলিং ফ্যানের ব্লেডে লেগে আহত হতেও দেখা গিয়েছে। তবুও তাদের ঘরের ঘুলঘুলিই যেন প্রিয়। পাশাপাশি তারাও প্রশ্রয় পেত গৃহস্থের প্রত্যেক সদস্যের কাছ থেকে। চড়ুইয়ের বিষ্ঠা, পালক, এসব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতেন তাঁরা। বর্তমানে বোধ হয় তাদের সেই উপস্থিতিকে উৎপাত বলেই মনে হয়। চড়ুইয়ের ঘুলঘুলি বন্ধ তাই। তবে গ্ৰামের দিকে, যেখানে হোগলা জাতীয় গাছ দেখা যায়, সেখানে তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় বটে। এখন চড়ুই আর অট্টালিকার পাখি নয়, তাই তাদের সেই গর্বের দিকটাও আজ ম্লান।
