Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

শ্রীচৈতন্য শুধু ভক্তির নয়, শক্তিরও প্রভু

Share Links:

মানস চক্রবর্তী

বাংলায় তখন ইসলামি শাসনকাল। হিন্দুদের ওপর আক্রমণ চলছে। হোসেন শাহ ওড়িশা আক্রমণের পরিকল্পনা করছেন। ইতিহাসের এরকম একটি সংকটকালে আবির্ভূত হন শ্রীচৈতন্যদেব। জগাই-মাধাই উদ্ধার হলেন।  তখন তাঁরাই কৃষ্ণপ্রেম মাতোয়ারা। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব নিত্যানন্দ প্রভুকে ঘরে ঘরে কৃষ্ণনাম প্রচার করার নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ শিরোধার্য করে নিত্যানন্দ নামলেন হরিনাম প্রচারে। একদিন হরিভক্ত শ্রীধর হরিনামে মত্ত হয়ে ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছেন। দেশ তখন যবনদের হাতে। তাই বিরূপ মন্তব্য শুনতে হল শ্রীধরকে। বৃন্দাবন দাস ‍‘শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবত’-এ লিখলেন,

‘গড়াগড়ি যায়েন শ্রীধর প্রেমরসে।/ বহির্মুখ সকলে দূরেতে থাকি হাসে।।/ কোন পাপী বলে হের দেখ ভাই সব।/ খোলাবেচা মিনষাও হইল বৈষ্ণব।।/ পরিধান বস্ত্র নাহি পেটে নাহি ভাত।/ লোকেরে জানায়, ভাব হইল আমাত।।/ নাগরিয়া গণ বলে মাগি খেয়ে মরে।/ অকালেতে দুর্গোৎসব আনিলেক ঘরে।।’

বিরুদ্ধপন্থীরা কুমন্তব্য আর  সমালোচনা করেই থেমে গেলেন না। তাঁরা কাজীর দরবারে গিয়ে অভিযোগ জানালেন। এই বিরুদ্ধপন্থীরা কারা? আজ যাঁরা লোভ এবং লাভের কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিয়ে স্বজাতি এবং স্বধর্মের নিন্দা করছেন, বিরোধিতা করছেন, সেদিনও কিছু মানুষ এভাবেই হরিনাম, হিন্দু ধর্মের বিরোধিতা করেছিলেন। সেদিনের বিরোধিতার কথা চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থে লেখা হল, ‘মৃদঙ্গ করতাল সংকীর্তন উচ্চধ্বনি।/ হরি হরি ধ্বনি বিনা অন্য নাহি শুনি।।/ শুনিয়া যে ক্রুদ্ধ হৈল সকল যবন।/ কাজী পাশে আসি সবে কৈল নিবেদন।।’ কাজী সন্ধ্যাবেলায় নবদ্বীপে এলেন পরিস্থিতি দেখতে। দেখলেন, তিনি যা শুনেছিলেন, সব সত্য। যেদিকেই কান পাতছেন, সেদিকেই কেবল হরিনাম সংকীর্তন। খুব রেগে গেলেন কাজী। হিন্দুদের মারধর করলেন, খোল ভেঙে দিলেন। বললেন, দেখি, নিমাই আচার্য কী করেন? শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবতকার বর্ণনা করেছেন, ‍‘কাজী বলে ধর ধর আজি কর কার্য।/  আজি বা কী করে তোর নিমাই আচার্য।।/ আথে ব্যথে পলাইল নাগরিয়াগণ।/ মহাত্রাসে কেশ কেহ না করে বন্ধন।/  যাহারে পাইল কাজী মারিল তাহারে।/ ভাঙ্গিল মৃদঙ্গ অনাচার কৈল দ্বারে।।/ কাজী বলে হিন্দুয়ানি হইল নদিয়া।/ করিব ইহার শাস্তি লাগালি পাইয়া।।/ ক্ষমা করি যাও আজি দৈব হৈল রাত্রি।/ আর দিন লাগালি পাইলে লইব জাতি।।/ এই মতো প্রতিদিন দুষ্টুগণ লৈয়া।/ নগরে ভ্রময়ে কাজী কীর্তন চাহিয়া।। দুঃখে সব নাগরিয়া থাকে লুকাইয়া।/ হিন্দুগণে কাজী সব মারে কদর্থিয়া।।’ ভয় পেয়ে গেলেন নবদ্বীপবাসী। ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। স্বয়ং রাজশক্তি যখন বিরুদ্ধে। হরিনাম সংকীর্তন বন্ধ। ভয়ে অনেকেই নবদ্বীপ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। খবর পৌঁছল নিমাইয়ের কাছে। শোনা মাত্রই প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত হয়ে পড়লেন নিমাই। হরিনাম প্রেমে শান্ত নিমাই হলেন রুদ্রমূর্তি। নিমাই সকলের উদ্দেশে বললেন, ‍‘পালানোর প্রয়োজন নেই। সকল বৈষ্ণবকে খবর দাও, আজই নবদ্বীপে কীর্তন হবে। আজ কাজীর ঘর পোড়াব। দেখি, কাজী এবং কাজীর রাজাই বা কী করে।’ রাজশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন নিমাই পণ্ডিত। বর্তমানে এই নিমাইকে আমরা ভুলে গিয়েছি। নিমাই শুধু ভক্তির নয়, শক্তিরও প্রভু। সন্ধ্যার প্রাকালে সকল বৈষ্ণবই একত্রিত হলেন। নিমাই পণ্ডিত নির্দেশ দিলেন, ‍‘তোমরা ঘরে ঘরে মশাল জ্বালো। নাম সংকীর্তনের জন্য তৈরি হও।’ ধর্ম রক্ষার জন্য সকল নবদ্বীপবাসী মশাল জেলে নিমাইয়ের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। মশাল কেন? নিমাই বললেন, ‍‘যারা হরিনামে বাধা দেবে, তাদের ঘর পুড়িয়ে দেবে। তাদের বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে।’ এবার শুরু হবে অভিযান। তিনি তাঁর বৈষ্ণব ভক্তদের সাজিয়ে নিলেন। সবার সামনে রাখলেন অদ্বৈত আচার্যকে। তাঁর সঙ্গে থাকবে একটি কীর্তন দল। মাঝখানে থাকবেন হরিদাস ঠাকুর। তাঁর সঙ্গেও একটি কীর্তন দল। তারপর শ্রীবাস পণ্ডিত। তাঁকে ঘিরেও একটি কীর্তন দল। আর নিত্যানন্দ প্রভুকে রাখলেন নিজের পাশে। বিরাট মিছিল।  মিছিলের নেতৃত্বে আরও যাঁরা রইলেন, তাঁরা হলেন, গদাধর, বক্রেশ্বর, মুরারি, গোপীনাথ, জগদীশ, গঙ্গাদাস, রামাই, গোবিন্দানন্দ, শ্রীচন্দ্রশেখর, বাসুদেব, মুকুন্দ, শ্রীধর, গোবিন্দ, জগদানন্দ, নন্দন আচার্য, শুক্লাম্বর প্রমুখ।

মিছিল বের হল। নিমাই পণ্ডিত চলেছেন। মানুষের ঢল নেমেছে পথে। প্রত্যেক মানুষের হাতে মশাল, বাজছে করতাল, মৃদঙ্গ, মন্দিরা। মুখে হরিনাম সংকীর্তন। শ্রীবৃন্দাবন দাস লিখেছেন, ‘চলিলেন মহাপ্রভু নাচিতে নাচিতে।/ লক্ষ কোটি লোক যায় প্রভুরে দেখিতে।।/ কোটি কোটি মহাদীপ জ্বলিতে লাগিল।/ চন্দ্রের কিরণ সর্বশরীরে হইল।।/ চতুর্দিকে কোটি কোটি মহাদীপ জ্বলে।/ কোটি কোটি লোক চতুর্দিকে হরি বলে।।/ দেখিয়া প্রভুর নৃত্য অপূর্ব বিকার।/ আনন্দে বিহ্বল সবে লোক নদিয়ার।।’

রাজশক্তির বিরুদ্ধে এত বড় মিছিল পূর্বে বোধহয় কখনও দেখেনি বাংলা। অপূর্ব সে মিছিল। একদিকে হরিনামে আকাশ-বাতাস মুখরিত। অন্যদিকে কাজী ও পাষণ্ডীদের প্রতি হুঙ্কার। শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবতে বৃন্দাবন দাস লিখলেন, ‍‘কেউ বলে এবে কাজী বেটা গেল কোথা।/ লাগালি পাইলে আজি চুর্ণ করো মাথা।।/ পাষণ্ডী ধরিতে কেহ নড় ধরি যায়।/ ধর ধর এই পাপ পাষণ্ডী পলায়।। বৃক্ষের উপরে গিয়া কেহ কেহ চড়ে।/ সুখে পুনঃপুনঃ গিয়া লাফ দিয়া পড়ে।।/ পাষণ্ডীরে ক্রোধ করি কেউ ভাঙে ডাল।/ কেহ বলে, এই মুঞি পাষণ্ডীর কাল।।’

নিমাই পণ্ডিত যখন তাঁর বিরাট মিছিল নিয়ে কাজীর নগরে এসে পৌঁছল, ভয়ে কাজী এবং তাঁর লোকজন পালিয়ে গেলেন। যিনি কাজে নিমাইকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন, তিনি স্বয়ং পালিয়ে গেলেন। নিমাই পণ্ডিত কাজীর দরজায় এসে হুঙ্কার দিলেন, ‍‘বেটা কাজী কোথায়? তাকে ধরে নিয়ে এসে মাথা কেটে ফেল।’ কাজী পালিয়ে গিয়েছেন। তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না।

সংকটকালে মহাপ্রভু শেখালেন, মারের বদলা মার। সেকুলারের দোহাই দিয়ে আজ যারা মার খেয়ে সান্ত্বনা পেতে চায়, তারা সত্যিই হতভাগ্য। ক্ষিপ্ত জনতা কাজীর ঘরে ঢুকে পড়ে। দরজা ভাঙা শুরু হল। কেউ কাজীর আম-কাঁঠালের ডাল ভাঙছে। নষ্ট করে দেওয়া হল কাজীর কলাবাগান। কাজীর সাজানো বাগান তছনছ করে দেওয়া হল। মহাপ্রভু এবার আদেশ দিলেন, ‍‘কাজী বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দাও। সারা বাড়ি ঘিরে আগুন দাও।’ তবে ঘরবাড়ি ভাঙচুর হলেও কাজীর  বাড়ি ঘরে শেষ পর্যন্ত আগুন দেওয়া হয়নি। প্রসঙ্গত এখানে আর একটি কথা জানিয়ে রাখি, নিমাইয়ের আন্দোলনে কেউ মারা যায়নি। যেটুকু হিংসাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল আন্দোলনে, তা দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালনের উদ্দেশ্যে।

এবার মহাপ্রভু বসলেন কাজীর দরজায়। লোকমাধ্যমে ডেকে পাঠানো হল কাজীকে। কাজী এতক্ষণ লুকিয়েই ছিলেন। এবার আর নিমাইয়ের ডাক অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। মাথা নত করে নিমাইয়ের কাছে উপস্থিত হলেন। গোবধ যে কলিতে নিষিদ্ধ, সে কথা কাজীকে বুঝিয়ে বললেন। শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের আদি লীলায় তার ব্যাখ্যা রয়েছে। মহাপ্রভুর সঙ্গে কাজীর অনেক কথোপকথন হল। মহাপ্রভু শেষে বললেন, নদিয়ায় সংকীর্তনে যেন বাধা না আসে, এইটি তোমাকে দেখতে হবে। সম্মত হলেন কাজী। হরিধ্বনি করে ফিরে চললেন নিমাই। জয় হল নিমাইয়ের। জয় হল স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত শক্তির।

3.5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए