ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

সিনেমা বা চলচ্চিত্র হল সেই মাধ্যম, যা মানুষের সামনে ঘটনার ধারাবিবরণকে সুচারুরূপে পরিস্ফুটিত করে। এর নান্দনিক উৎকর্ষতার ওপরই সিনেমার মান (standard) নির্ধারিত হয়। ‘হিট’ অথবা ‘ফ্লপ’-এর মাপকাঠিতে এর শৈল্পিক গুণমান নির্ণীত না হলেও জনতার ভালো লাগার বিষয়টিকে একেবারে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর সে কারণেই ৫০ বছর পার করেও দর্শকমনে সমান আবেগ সঞ্চারে সফল কোনও সিনেমার আবেদন একটি মাইলফলক রূপেই পরিগণিত হয়। রমেশ সিপ্পির পরিচালনায় ‘শোলে’ হল সে ধরনেরই একটি মাইলফলক। কেননা আগের সব রেকর্ড ভেঙে হিন্দি সিনেমাকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে এর জুড়ি মেলা ভার।
‘শোলে’ ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের একটি হিন্দিভাষী অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র, যা পরিচালনা করেছিলেন রমেশ সিপ্পি এবং প্রযোজনা করেছিলেন তাঁর বাবা জি পি সিপ্পি। কাহিনি অনুসারে, দুই সাধারণ পাতি অপরাধী বীরু (ধর্মেন্দ্র) ও জয় (অমিতাভ বচ্চন)-কে প্রাক্তন পুলিশ অফিসার ঠাকুর সিং নিযুক্ত করেন নিষ্ঠুর ডাকাত গব্বর সিংকে (আমজাদ খান) ধরার জন্য। হেমা মালিনী এবং জয়া ভাদুড়ি অভিনয় করেছেন বীরু ও জয়ের প্রণয়ী হিসাবে।
শোলে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র হিসাবে স্বীকৃত। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট প্রকাশিত সর্বকালের শীর্ষ দশটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের তালিকায় এটি প্রথম স্থান পায়। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ৫০তম ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের বিচারকরা এটিকে ‘৫০ বছরের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র’ বলে অভিহিত করেন।
শোলে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কেবল একটি অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা নয়, বরং সর্বাঙ্গীণ বিনোদনের মহাচলচ্চিত্র হিসাবে স্বীকৃত। শোলের কাহিনিতে অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার প্রধান জায়গা নিয়েছে। পাহাড়ি প্রান্তরে ডাকাত গব্বর সিং ও তার দলের সঙ্গে পুলিশ ও গ্রামের যুবাদের লড়াই দর্শকদের উত্তেজিত করে। ঘোড়দৌড়, বন্দুকযুদ্ধ, বিস্ফোরণ, গ্রামীণ প্রান্তরের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের দৃশ্য— এসবই সে সময়কার দর্শকদের কাছে নতুন ধরনের রোমাঞ্চ এনে দেয়। সাতের দশকের হিন্দি সিনেমায় এই মাপের ওয়েস্টার্ন ধাঁচের অ্যাকশন দৃশ্য আগে দেখা যায়নি। শোলে কেবল লড়াই নয়, এতে আছে অপার হাস্যরস।
বাসন্তীর (হেমা মালিনী) অগাধ বাচালতা, তাঁর ‘চল ধন্নো’ সংলাপ, কৌতুকপূর্ণ দৃশ্য, হাসিঠাট্টা, সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রটি দর্শকদের একদিকে যেমন থ্রিল দেয়, অন্যদিকে উপহার দেয় প্রাণভরে হাসার মুহূর্ত। হাস্যরস ও আবেগের মিশ্রণে তৈরি প্রেমকাহিনি দর্শকদের আবেগ ছুঁয়ে যায়। আর ডি বর্মন সুরারোপিত গানগুলি চলচ্চিত্রটির বিনোদনমূল্য বহুগুণ বাড়িয়েছে। ‘ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে’ বন্ধুত্বকে জাতীয় স্তরে জনপ্রিয় করে তোলে। ‘মেহবুবা মেহবুবা’ গানে অথবা ‘হোলি হ্যায়’-তে বিনোদনের সব মশলা বিদ্যমান।
আমজাদ খানের গব্বর সিং চরিত্রটি হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। গব্বর একদিকে নির্মম, অন্যদিকে তাঁর চরিত্রে এক অদ্ভুত রস আছে, যা দর্শককে ভয় দেখিয়েও আনন্দ দেয়। চলচ্চিত্রে গ্রামীণ সমাজের ভয়ের পরিবেশ, ডাকাতদের দৌরাত্ম্য, সাধারণ মানুষের দুঃখ— এসবের সঙ্গে ন্যায়-অন্যায়ের লড়াই দর্শকের মধ্যে সামাজিক আবেগ জাগায়। তাই ‘বিনোদন’ শুধু হাসি বা অ্যাকশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ন্যায়ের প্রতি টান ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আনন্দও এ চলচ্চিত্রে প্রতিভাত হয়েছে।
শোলে’কে বলা হয় ‘Mass entertainer’— অর্থাৎ সবার জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা। যুবক-যুবতীর জন্য রোম্যান্স, কিশোরদের জন্য অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার, বয়স্ক দর্শকদের জন্য আবেগ ও সামাজিক বার্তা এবং সবার জন্য হাস্যরস ও সংলাপ। তাই শোলের বিনোদনমূল্য বহুমাত্রিক। এটি কেবল সিনেমা নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। এতে আছে হাসি, কান্না, ভয়, রোমাঞ্চ, প্রেম, গান, নাচ— অর্থাৎ সিনেমাটিক বিনোদনের পূর্ণাঙ্গ সংমিশ্রণ। এ কারণেই মুক্তির পর থেকে আজও এটি দর্শকদের মনে অমর হয়ে রয়েছে, আর ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অতুলনীয় বিনোদনের পরাকাষ্ঠা হিসাবে দণ্ডায়মান।

A nice article about the all time blockbuster SHOLAY on its completion of Golden Jubilee year 👌