ভাস্কর সেনগুপ্ত

কয়েকজন বন্ধু নিউটনের পরীক্ষাগারে ঢুকে দেখলেন, এক অপূর্ব মহাবিশ্বের মডেল সামনে বসানো আছে। যিনিই জিজ্ঞেস করছেন মডেলের স্রষ্টার নাম, নিউটনের উত্তর, কেউ বানাননি। সকলেই বিস্মিত। কেউ বানাননি, এটা হতে পারে নাকি!
নিউটন এবার বললেন, প্রকৃতির যদি কোনও স্রষ্টা না থাকেন, তাহলে এই মডেলেরও কোনও স্রষ্টা নেই।
আমরা সকলেই এই ভ্রান্তি নিয়ে আছি। জগতের সকল বিষয়ের স্রষ্টার খোঁজ রাখি, কিন্ত প্রকৃতির স্রষ্টা যে ঈশ্বর, তাঁকে মানি না, জানি না, জানতে চাই না।
অঙ্ক নিয়ে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন, তাঁরা সকলেই জানেন, রুট ওভার মাইনাস ওয়ান কাল্পনিক সংখ্যা। সেই কাল্পনিক সংখ্যার ওপর নির্ভর করে কমপ্লেক্স অ্যালজেবরার অঙ্ক দাঁড়িয়ে আছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিমূল। রুট ওভার মাইনাস ওয়ানকে পরিহার করলে বিজ্ঞানের কোনও অস্তিত্ব থাকে না। অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞান কল্পনানির্ভর, কল্পনাপ্রসূত। তাই ভগবানকে যদি একটু কল্পনাও করি, আমাদের কী ক্ষতি আছে? পুত্রহারা জননী দেবীর মন্দিরে প্রার্থনা করে যে শান্তি পান, তা ছিনিয়ে নেওয়ার কি অধিকার আছে বিজ্ঞানের?
ধরুন, তানসেন গান ধরেছেন। শ্রোতারা সুরের মুর্চ্ছনায় আপ্লুত। সে সময এক বিজ্ঞানী এসে বললেন, এই সা রে গা মা পা আর কিছুই নয়, বিভিন্ন frequency মাত্র। এগুলির সমন্বয়ে এই গানের সৃষ্টি। গানের পরিবেশকে গলা টিপে হত্যা করা হল।
বিস্তীর্ণ প্রান্তরে কেউ যদি দেখতে পায়, একটি সুচ পড়ে আছে, সে বলতে পারবে, আমি দেখেছি। যে দেখেনি, তাকে আতিপাতি করে খুঁজতে হবে দেখিনি ঘোষণা করার আগে। হ্যাঁ, আছে বলা সহজ। না, নেই বলা অনেক কঠিন। ঈশ্বর আছেন, অনেকেই বলেছেন। ঈশ্বর নেই বলার আগে সেই অনুসন্ধান কী করেছেন?
বিজ্ঞান বলে, প্রমাণ ব্যতিরেকে কিছুই মানি না। পরীক্ষাগারে যা প্রমাণিত নয়, তা মানি না। কিন্তু বহু জিনিস বিজ্ঞান প্রমাণ ছাড়াই গ্রহণ করেছে। Avogadro number কেউ প্রমাণ করেননি। Absolute zero কেউ প্রমাণ করেননি। Black body কেউ প্রমাণ করেননি।
অতি শৈশব থেকে আমরা মেনে নিতেই অভ্যস্ত। পাঠ্যপুস্তকের লেখকের কথা যদি না মেনে নিতাম, তাহলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কোনওদিন হতাম না। বিজ্ঞানীদের ঘোষণা আমরা মেনেইনি, পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে দেখি না। সাধু-মহাত্মারা যখন বলেন, ঈশ্বর আছেন, তখন আমাদের মানতে বাধা কোথায়?
প্রকৃতপক্ষে আমরা যেটা ইচ্ছে, সেটা মানি। যা ইচ্ছে নয়, তা মানি না। যুক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে প্রমাণ করা যায় না। সাধু-মহাত্মাদের প্রদর্শিত পথে চললে ঈশ্বরকে জানা, দেখা যায়, যেমন বিজ্ঞান জানতে হলে বিজ্ঞানীদের পথে চলতে হয়।
