সুদীপনারায়ণ ঘোষ

২০২৫ সালের আগস্ট। জাপানে গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় টোকিওর দর্শক পরিপূর্ণ একটি প্রেক্ষাগৃহ। সকলে নিবিষ্ট হয়ে শুনছে মঞ্চে উপবিষ্ট মহিলা ইউকো ওকুদার কথা। তাঁর পিছনে ছবি প্রদর্শনের পরদা। স্পষ্টতই সেখানে কোনও ছবি প্রদর্শিত হচ্ছিল না। বিশ্বের ওই অংশে এটা খুব স্বাভাবিকও বলা যায় না। কারণ মঞ্চে উপবিষ্ট মহিলা আলোচনা করছিলেন রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে। প্রসঙ্গটা ছিল মহান চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সুলেখক সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’। এটা ছিল সত্যজিতের অন্যতম মাস্টারপিস এবং গত বছর জাপানে তাঁর যে সাতটি ছবির রেট্রোস্পেক্টিভ দেখানো হয়েছিল, তার অন্যতম।
প্রদর্শিত ছবিগুলির সারিতে ছিল ‘জলসাঘর’, ‘মহানগর’, চারুলতা’, ’কাপুরুষ মহাপুরুষ’, ‘নায়ক’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’। এগুলি প্রায় দু’দশকব্যাপী সত্যজিতের সর্বাপেক্ষা স্মরণযোগ্য ছবির অন্তর্ভুক্ত। তবে জাপানে প্রথম প্রদর্শিত হয়েছে গত বছর জুলাইয়ে। সঙ্গে ছিল জাপানি সাবটাইটেল।
জাপানের প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্র নির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়া একবার বলেছিলেন, পৃথিবীতে জন্মে কেউ যদি চাঁদ আর সূর্য না দেখে, তার জীবন যেমন বৃথা, তেমনই পৃথিবীতে জন্মে কেউ যদি সত্যজিৎ রায়ের এই চলচ্চিত্রগুলি না দেখে, তার জীবনও তেমনই বৃথা।
জাপানি ডিস্ট্রিবিউটর তোহো তোয়া কোম্পানি স্থাপন করেছিলেন নাগামাসা কাওয়াকিতা। তাঁর স্ত্রী কাসিকো কাওয়াকিতা ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের পরম অনুরাগী। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন সত্যজিতের অনুগামী। তাঁরাই ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সত্যজিৎ রায়ের সব ছবির জাপানে প্রচলন করেছিলেন। ১৯৬৬ সালে কাওয়াকিতাই সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কুরোসাওয়ার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। জাপানে সত্যজিতের চলচ্চিত্রগুলি বরাবরই খুব ভালো ব্যবসা করেছে। তাই তাঁরা প্রতিবছর তাঁর নতুন নতুন ছবি চেয়ে পাঠান।
এই সাতটি ছবির প্রিন্ট পুনরুদ্ধার করতে হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে টোকিওর লা সিনেমা বাঙ্কামুরা প্রেক্ষাগৃহে উদ্ধার করা এই ছবিগুলি প্রদর্শিত হয়েছিল। প্রথমে ঠিক হয়েছিল এই রেট্রোস্পেক্টিভ চলবে তিন সপ্তাহ, কিন্তু পরে চাহিদার কারণে প্রদর্শনী বাড়িয়ে চার সপ্তাহ করা হয়েছিল। এই ছবিগুলি শুধু টোকিও নয়, হিরোশিমা, ওসাকা, কিয়োটো প্রভৃতি শহরে প্রদর্শিত হয়েছিল। ১৫-২০টি প্রেক্ষাগৃহে ছবিগুলি প্রদর্শিত হয়েছিল। আর ডি বনসল সত্যজিতের প্রথমদিকের বিখ্যাত ছবিগুলির প্রযোজক ছিলেন। তাঁর সুযোগ্যা পৌত্রী বর্ষা বনসল এই ছবিগুলি পুনরুদ্ধার করেছেন।
ওই প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আলোচনা ও বার্তালাপ। যেমন, চলচ্চিত্র গবেষক ও প্রযোজক এরি মোরিনা ‘মহানগর’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এশীয় চলচ্চিত্র গবেষক তামাকি মাৎসুওকা জলসাঘর ছবি প্রদর্শনের পর তার ওপর ভাষণ দিয়েছিলেন।
প্রথমেই যাঁর কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই ইউকা ওকুদা একজন রবীন্দ্রসংগীত গায়িকা এবং বাংলা ভাষার শিক্ষিকা। চারুলতা প্রদর্শনের পর এ বিষয়ে তিনি এক মনোজ্ঞ ও বিদগ্ধ পর্যালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এ ছবির ওপর রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব নিয়ে কিছু গম্ভীর আলোচনা করেছি। তার পর দর্শকরা ছবিটি ফের দেখতে চান। তখন আমরা ফের বুঝতে পারলাম যে, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রগুলি গভীরভাবে স্তরান্বিত এবং অসাধারণ সৃষ্টি।’

