কাজল মুখার্জি

২ মে ভারতীয় ও বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক গৌরবময় তারিখ। এই দিনটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই মহান ব্যক্তিত্ব, যিনি কেবল বাংলা চলচ্চিত্র নয়, সমগ্র ভারতীয় সিনেমাকে এনে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তিনি সত্যজিৎ রায়, চলচ্চিত্রকার, সাহিত্যিক, চিত্রনাট্যকার, সংগীত পরিচালক, চিত্রকর ও বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিক্নির্দেশক।
সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতার এক বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং পিতা সুকুমার রায়, দু’জনই বাংলা শিশুসাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক। প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষে সত্যজিৎ বিশ্বভারতীর শান্তিনিকেতনে চিত্রশিল্প অধ্যয়ন করেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব এবং ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির মূর্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি পথের পাঁচালী (১৯৫৫) শুধু বাংলা নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রকে এক নতুন ভাষা ও মানবিক অনুভবের মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিল। বিমল রায়ের সহায়তায় তৈরি এ ছবি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ পুরস্কার জিতে নেয়। এরপর অপরাজিত, অপুর সংসার মিলে গঠিত হয় কালজয়ী ‘অপু ট্রিলজি’। তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত
চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে চরণকুমার, চারুলতা, নায়ক, অরণ্যের দিনরাত্রি, জন অরণ্য, শতরঞ্জ কে খিলাড়ি, ঘরে বাইরে, আগন্তুক প্রভৃতি। তাঁর ছবির বিশেষত্ব ছিল মানবিকতা, বাস্তবতা এবং চরিত্রগুলির মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সত্যজিৎ রায় ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখক। তিনি সৃষ্টি করেছিলেন ‘ফেলুদা’ নামক জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র এবং ‘প্রফেসর শঙ্কু’ নামক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির নায়ক। ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় তাঁর অবদান বাঙালি শিশু-কিশোর সাহিত্যকে এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেয়।
সত্যজিৎ রায় বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৯২ সালে ভারত সরকার তাঁকে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করে। তাঁকে সম্মানিত করা হয়েছে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড ফর লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট, অস্কার এবং আরও বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে, যা হলিউড থেকেও তাঁর স্বীকৃতি বহন করে।
সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি কোনও নির্দিষ্ট সময় বা গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কাজ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, শিক্ষণীয় ও মননশীল। তিনি ছিলেন একজন দৃষ্টিশীল শিল্পী, যিনি ছবির পর্দা দিয়ে মানুষের হৃদয় ও সমাজের অন্তর্জগৎ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। তাঁর সৃষ্টি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চিরকালীন অনুপ্রেরণা। আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই মহান শিল্পীকে, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন, ছবি কেবল বিনোদন নয়, এক গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক ভাষাও হতে পারে।
