Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ঋত্বিক ঘটক: মানবতার জয়গাথায় এক বেপরোয়া যোদ্ধা

ঋত্বিক ঘটক বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক বিপ্লবী স্রষ্টা, যিনি সিনেমাকে শিল্প থেকে সমাজের কণ্ঠে পরিণত করেছিলেন। তাঁর সিনেমা বাঙালির ইতিহাস, বেদনা ও চেতনার সমষ্টিগত প্রতিফলন।

Share Links:

ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ
সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

এ বছর কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের (৪ নভেম্বর, ১৯২৫-৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) জন্মশতবর্ষ। তিনি একাধারে ছিলেন একজন দার্শনিক, চিন্তাবিদ, নাট্যকার, অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক ও তাত্ত্বিক, যিনি বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমাকে দিয়েছেন নতুন ভাষা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন মানবিক বোধ। তিনি এমন একসময় চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে আসেন, যখন ভারত সদ্য স্বাধীনতা লাভ করেছে, কিন্তু দেশ ভাগের ক্ষত তখনও তাজা। ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের ফলে পূর্ববাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আসা উদ্বাস্তুর বেদনাকে তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাঁর সিনেমার কেন্দ্রে তাই উঠে এসেছে এই বিভাজনের বেদনা, পরিচয়হীনতা, স্থানচ্যুতি ও অস্তিত্বের সংকট।

ঋত্বিক ঘটক সিনেমাকে বিনোদনের মাধ্যম নয়, সমাজ পরিবর্তনের অস্ত্র হিসাবে দেখতেন। বাংলা সিনেমায় তখন সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ মানবিক বাস্তবতার নতুন দিগন্ত খুলেছে, মৃণাল সেন সমাজবীক্ষার দিক থেকে নতুন চিন্তাপথ নির্মাণে ব্যস্ত। সে সময় ঋত্বিক ঘটক তাঁর নিজস্ব রূঢ়, কাব্যময়, মর্মস্পর্শী ভাষায় চলচ্চিত্রকে এক গভীর সামাজিক চেতনার শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘Cinema is no entertainment; it is a weapon for social awareness.’

মরমী চলচ্চিত্রকার ঋত্বিককুমার ঘটক জন্মগ্রহণ করেন ঢাকার ঋষিকেশ দাশ লেনে, ঐতিহ্যময় ঘটক পরিবারে। তাঁদের আদি নিবাস ছিলে বাংলাদেশের পাবনার ভারেঙ্গায়। তাঁর বাবার নাম সুরেশচন্দ্র ঘটক এবং মায়ের নাম ইন্দুবালা দেবী। তিনি বাবা-মায়ের ১১তম সন্তান। সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। কবি ও নাট্যকার হিসাবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। তাঁর বড় ভাই মনীশ ঘটক ছিলেন ওই সময়ের খ্যাতিমান এবং ব্যতিক্রমী লেখক। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক এবং একজন সমাজকর্মী। মনীশ ঘটকেরই মেয়ে বিখ্যাত লেখিকা ও সমাজকর্মী মহাশ্বেতা দেবী।

১৯৪৭-এর ভারত ভাগের ফলে ঘটক পরিবার কলকাতায় চলে আসতে বাধ্য হয়। নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে শরণার্থী হওয়ার মর্মবেদনা ঋত্বিক কোনও দিন ভুলতে পারেননি এবং তাঁর জীবনদর্শন নির্মাণে এই ঘটনা ছিল প্রধান নির্ধারক। শরণার্থী জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও সংকট তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে এবং পরবর্তী জীবনে তাঁর চলচ্চিত্রে এর স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। ঋত্বিক ঘটক ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহি কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৮-এ বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এমএ কোর্স শেষ করেও পরীক্ষা না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন। তিনি নাটকের প্রতি এতই আকৃষ্ট হয়ে পড়েন যে, সে নেশাতেই এমএ কোর্স শেষ করেও পরীক্ষা না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন।

বরেণ্য এই চলচ্চিত্র পরিচালক ছাত্রাবস্থা থেকেই কলম নিয়ে সমাজ পরিবর্তনের যুদ্ধে নামেন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি লেখেন তাঁর প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’। ওই বছরেই তিনি নবান্ন নামক পুনর্জাগরণমূলক নাটকে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (আইপিটিএ) যোগদান করেন। সে সময় তিনি নাটক লেখেন, পরিচালনা ও অভিনয় এবং বের্টোল্ট ব্রেখট ও নিকোলাই গগোলের রচনাবলি বাংলায় অনুবাদ করেন। ঋত্বিক ঘটক ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ সিনেমার মধ্য দিয়ে। তিনি এই ছবিতে একইসঙ্গে অভিনয় এবং বিমল রায়ের সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেন। তার দু’বছর পর ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর একক পরিচালনায় প্রথম ছায়াছবি ‘নাগরিক’ নির্মিত হয়।

মাত্র ৫১ বছরের জীবদ্দশায় ঋত্বিককুমার ঘটক পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পেরেছিলেন ৮টি। স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন মোট ১০টি। আরও অনেকগুলি কাহিনিচিত্র, তথ্যচিত্রের কাজে হাত দিয়েও শেষ করতে পারেননি। গত শতকের পাঁচের দশকে শিল্প-সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিপ্লবের ছোঁয়া আনতে যে ক’টি নাম উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে ঋত্বিক ঘটক অন্যতম।

১৯৫৮-তে ঋত্বিকের বিখ্যাত ছবি ‘অযান্ত্রিক’ মুক্তি পায়। অযান্ত্রিক প্রসঙ্গে আর এক প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় উল্লেখ করেন, ‘ঋত্বিক ঘটকের দ্বিতীয় ছবি অযান্ত্রিক যাঁরা দেখেছিলেন, তাঁরা তাঁর অসামান্য বৈশিষ্ট ও মৌলিকতার পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত হয়েছিলেন।’ ট্যাক্সি ড্রাইভার বিমলের যে চরিত্র ঋত্বিক নির্মাণ করেন, তার সঙ্গে পরবর্তীতে মিল পাওয়া যায় সত্যজিতের অভিযান (১৯৬২) সিনেমার ট্যাক্সি চালক নারা সিং ও মার্টিন স্করসেসির ট্যাক্সি ড্রাইভার (১৯৭৬)-এর ট্রাভিস বিকেল চরিত্রের। ‘অযান্ত্রিক’ ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। ‘অযান্ত্রিক’ তৈরি হয়েছিল সুবোধ ঘোষের প্রথম ছোটগল্প ‘অযান্ত্রিক’ থেকে। একজন মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে তৈরি সম্পর্ক নিয়েই নির্মিত এই সিনেমাটি। একই বছর অর্থাৎ ১৯৫৮-তেই ঋত্বিকের তৃতীয় চলচ্চিত্র ‘বাড়ী থেকে পালিয়ে’ মুক্তি পায়। মূল গল্প শিবরাম চক্রবর্তীর। গল্পের মূল চরিত্র কাঞ্চনের চোখ দিয়ে তিনি তৎকালীন কলকাতার জীবন্ত ছবি অঙ্কন করেন। এই ছায়াছবি সমকালীন কলকাতার নগরজীবনের ভয়াবহতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিল। ১৪ এপ্রিল, ১৯৬০ মুক্তি পায় ‘মেঘে ঢাকা তারা’। এই ছবির মাধ্যমে যুগযন্ত্রণার করুণ অধ্যায় পরিস্ফুট হয়। তাঁর প্রথম সাফল্য আসে এই ছবিতেই। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বার্ষিক ‘চিত্রবীক্ষণ’ পত্রিকায় ঋত্বিক ঘটক জানান, দেশ বিভাগের প্রেক্ষাপটে নির্মিত মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) এবং সুবর্ণরেখা (১৯৬২), এই তিনটি চলচ্চিত্র মিলে ট্রিলজি নির্মিত হয়েছে। ঋত্বিকের এই ট্রিলজিতে রবীন্দ্রসংগীতের একটি বড় ভূমিকা ছিল।

১৯৬২-তে ঋত্বিক স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘সিজর্স’ ও ১৯৬৩-তে ডকুমেন্টারি ‘ওস্তাদ আলাউদ্দীন খান’ নির্মাণ করেন। সে সময় ‘বগলার বঙ্গদর্শন’ নামে একটি সিনেমার কাজ শুরু করলেও শেষ করতে পারেননি। ১৯৬৫-র শেষদিকে বাংলা মদের নেশা ধরেন, এমনকী স্নান করাও ছেড়ে দেন। তাঁর এমন জীবনযাত্রার ফলে অতিষ্ঠ হয়ে স্ত্রী ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হন। ঋত্বিক ঘটক ১৯৬৫-তে স্বল্প সময়ের জন্য পুণেতে বসবাস করেন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি পুণের ‘ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট’-এ ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে যোগ দেন। তারপর একই প্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষ হিসাবেও কাজ করেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিজোফ্রোনিয়ায় আক্রান্ত হন। ‘সুবর্ণরেখা’ নির্মাণের পর দীর্ঘদিন তাঁর হাতে কোনও ছবির কাজ ছিল না। নিজের ওপর অত্যাচারের জেদ পেয়ে বসে ওই সময় থেকেই। মদ তখন তাঁর ব্যর্থতা ভোলার অনুষঙ্গ। ওই সময় তিনি একবার মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং দীর্ঘদিন তাঁকে মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল। নিজের শরীরের ওপর অত্যাচারের ফলেই তিনি ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হন। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৭৪-তে মুক্তি পায় ঋত্বিকের শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। এই সিনেমাটি তাঁর আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র। মূল চরিত্র একজন মাতাল বুদ্ধিজীবী নীলকণ্ঠ বাগচি, যে তার বন্ধুদের মতো সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে নিজেকে বিক্রি করে দেয়নি। নীলকণ্ঠ চরিত্রে অভিনয় করেন ঋত্বিক স্বয়ং। অবশ্য তার আগে অদ্বৈত মল্লবর্ধনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতেও তিনি নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। মানবতার অপমানে শিল্পীর গর্জন তাঁর ছবিকে ধ্রুপদী শিল্পের স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল।

ঋত্বিক ঘটক বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক বিপ্লবী স্রষ্টা, যিনি সিনেমাকে শিল্প থেকে সমাজের কণ্ঠে পরিণত করেছিলেন। তাঁর সিনেমা বাঙালির ইতিহাস, বেদনা ও চেতনার সমষ্টিগত প্রতিফলন। তিনি বলেছিলেন, ‘I want to reach the mass through my films. I want to awaken them.’ তাঁর সেই জাগরণের আহ্বান আজও প্রাসঙ্গিক। ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা আজও আমাদের শেখায়, সিনেমা মানুষ, বেদনা, প্রতিরোধ ও আশার এক অবিনাশী কাব্য। তাঁর চলচ্চিত্রে দেখা যায় একটি যুগের ‘অস্তিত্ব সংকট’। কিন্তু এই সংকট কোনও ব্যক্তিগত কাহিনি নয়, এটি একটি সমষ্টিগত ট্র্যাজেডি, যেখানে নীতা, অনসূয়া, সীতা, শঙ্কর কিংবা ঈশ্বর, সবাই সেই সমাজের প্রতীক, যারা দেশ ভাগের অভিঘাতে নিজেদের সত্তা হারিয়েছে। ঋত্বিক ঘটক তাঁর শিল্পে বাস্তবতার সঙ্গে মিশিয়েছেন লোকসংস্কৃতি, সংগীত, প্রতীক ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। তাঁর সিনেমার আবহে রয়েছে বাউল গান, কীর্তন, নাগরিক জীবনের কলরব, নদীর স্রোত, আকাশের প্রতীকী পরিধি। এভাবে তিনি চলচ্চিত্রকে ভারতীয় সংস্কৃতির অন্তরাত্মার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর আগমন বাংলা সিনেমায় এক দার্শনিক আন্দোলনের সূচনা করে, যা সত্য ও বেদনার মিলনে তৈরি। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্র ছিল সমাজ ও ইতিহাসের আত্মানুসন্ধান। ফলে ঋত্বিক ঘটককে শুধু একজন শিল্পী হিসাবে দেখা চলে না, তিনি ছিলেন এক যুগসাক্ষী, যিনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর সময়ের রক্তক্ষরণ রেকর্ড করে গিয়েছেন।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

লিটল ভয়েস বিগ ড্রিম— এক কিশোর প্রতিভার সুরেলা উদযাপন

কলির কেলোবাজি

বাবা ও ছেলের মানবিক সম্পর্কের ছবি ডেভিড 

নিস্তব্ধতার বিরুদ্ধে মঞ্চের ডাক, নাটকেই ফিরছে প্রতিবাদ

হারমোনিয়াম চলচ্চিত্রের পঞ্চাশ বছর

বাংলা সিনেমার তুলসী-তলা

হিন্দি সিনেমার মহীরুহ ধর্মেন্দ্র 

বাঁকুড়ায় যাত্রাপালায় অভিনয় দক্ষতায় সমুজ্জ্বল চার কন্যা

জমজমাট ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

হৃষিকেশ মুখার্জির ‘আনন্দ’ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমর দলিল