কাজল মুখার্জি

প্রতিবছর আষাঢ় মাস এলেই পুরীতে দেখা যায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা। সূর্যের আলো মেঘে কিছুটা ঢাকা। মন্দিরচূড়ায় পতপত করে ওড়ে পতাকা। রথযাত্রা আসছে।
এই রথযাত্রার সূচনার ইতিহাসে রয়েছে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের তৈরি বারো শতকের মন্দির। আর পুরাণে উল্লিখিত স্কন্দ ও ব্রহ্ম পুরাণে উঠে আসে, দেবতা নিজে রথে চড়ে রাস্তায় বেরোন। এ ঈশ্বরের অভিসার।
জগন্নাথ মানে বিশ্বের অধীশ্বর, আর এ যাত্রা মানে ঈশ্বরের সেই প্রগাঢ় প্রেমে মানুষের কাছে আসা। রথযাত্রা কেবল কোনও পবিত্র আচার নয়, এটি এক সামাজিক উদযাপন, যেখানে ধর্ম ও সংস্কৃতির বাইরেও রয়েছে মানবিক মেলবন্ধনের গল্প। কাঠ মিস্ত্রি, শিল্পী, রং মিস্ত্রি, সেবায়েত, কাপড় বোনা তাঁতি, চিত্রকর, সকলেই রথ নির্মাণে যুক্ত হন।
এক একটি রথ যেন চলন্ত সমাজ। তাতে নেতৃত্ব দেন শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেব স্বয়ং, আর রথ টেনে এগিয়ে নিয়ে যায় মানুষ। এ দড়িতে টান দেওয়া মানে শুধু ঈশ্বরের রথকে নয়, নিজের ভিতরের ঈশ্বরকে জাগিয়ে তোলা।
পুরীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ রথযাত্রায় ভিড় করে। এছাড়াও দেশের বহু গ্রাম ও শহরে ছোট ছোট রথও একই উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে টানা হয়। কোথাও রথে বসানো হয় কাগজের প্রতিমা, কোথাও পুতুলের আকারে তিন ভাইবোন। এসব রথ ছোট, কিন্তু বিশ্বাসে বড়। অনেকেই বলে থাকেন, বাড়ির উঠোনে একচাকার রথ হলেও জগন্নাথ তাতে থাকেন, যদি বিশ্বাস থাকে।
এ উৎসবে মানুষ শুধু ঈশ্বরকে নয়, খোঁজে একে অপরকে। উৎসব কয়েকদিনের, কিন্তু তা থেকে জন্ম নেয় সারা বছরের আত্মিক সম্পর্ক। এখন ইস্কনের মাধ্যমে বিশ্বের নানা শহরে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, মেলবোর্ন, এমনকী আফ্রিকার বহু শহরেও। মানুষ আলাদা, ভাষা আলাদা, কিন্তু সেই একই চাকা, একই প্রেম, একই গান, ‘জয় জগন্নাথ! জয় সুভদ্রা! জয় বলরাম!’ জগন্নাথের এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে উপস্থিতি যেন বলে দেয়, দেবতা কেবল পুরীর মন্দিরে নয়, মানুষ যেখানে ভালোবাসা নিয়ে থাকে, তিনি সেখানেই বিরাজমান।
আমার জীবনে রথযাত্রা কেবল দর্শন নয়, এক অভিজ্ঞতা। ছোটবেলায় বেহালায় পাড়ায় নিজের হাতে সাজানো রথে দড়ি বেঁধে ভাইবোনরা মিলে ঘুরতাম। দড়ি টানার সময় মনে হত, সত্যিই দেবতা এগিয়ে চলেছেন। তারপর রেলের চাকরির সুবাদে এবং নিজের উৎসাহে অনেক জায়গায় দেখেছি রথযাত্রা। পুরি, শ্রীরামপুর, মালদা, নিউ জলপাইগুড়ি, আসানসোল, ধানবাদ, রাঁচি, মুঘলসরাই, বেনারস, দিল্লি প্রভৃতি জায়গায় রথযাত্রার সাক্ষী হয়েছি। কোথাও গাড়িকে সাজিয়ে তৈরি রথ, কোথাও লোহার চাকার উপর কাঠের গঠন। সব জায়গার অভিজ্ঞতা আলাদা, কিন্তু বিবেকের অভ্যন্তরের অনুভূতি এক, এ রথে ঈশ্বর আমাদের দিকে এগিয়ে আসেন, আর আমরা ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে যাই।
অবসর জীবনে এখন যখন স্মৃতি রোমন্থন করি, তখন বুঝি, এ রথ ছিল আমার জীবনরথেরই প্রতিরূপ। এভাবেই প্রায় প্রতিদিন আমরা কেউ না কেউ একে অপরের কাছে দেবতার মতোই এগিয়ে আসি।
রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এ এক সামাজিক, মানবিক এবং সাংস্কৃতিক আত্মোপলব্ধির দিন। এ বছর ২৭ জুন যখন ফের পুরীতে রথ গড়াবে, রঙিন কাপড়ে ঢেকে যাবে রথের কাঠ, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যখন লক্ষ মানুষ রথ টানবে, তখন আমাদের হৃদয়রথেও ভালোবাসা, মানবতা, মিলনের টান দেওয়া উচিত। তবেই তো রথযাত্রা সফল, যখন রথ শুধু মন্দির থেকে গুণ্ডিচা নয়, মানুষের হৃদয় থেকে হৃদয়ে পৌঁছে যায়।
