সুদীপনারায়ণ ঘোষ

বাংলা সাহিত্যে বিশুদ্ধ হাস্যরসের যথেষ্ট অভাব ছিল গত শতকে। এখনও অবস্থা খুব উন্নত হয়নি। হাস্যরস বলতে যা পরিবেশিত হয়, তার বেশিরভাগই পৌনঃপুনিকতা, স্থূলতা, অশ্লীলতা বা ভাঁড়ামি। যে ক’জন বাংলা সাহিত্যের হাস্যরসের ধারায় বৌদ্ধিক বিশুদ্ধতা এনেছিলেন, তাঁদের মধ্যে রাজশেখর বসু অন্যতম।
একাধারে প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক, অনুবাদক, রসায়নবিদ ও অভিধান প্রণেতা রাজশেখর বসু ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ বর্ধমান জেলার বামুনপাড়া গ্রামে মামার বাড়ি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল নদিয়ার বীরনগর (উলা) গ্রামে। তাঁর বাবা দার্শনিক পণ্ডিত চন্দ্রশেখর বসু ছিলেন দ্বারভাঙ্গা এস্টেটের ম্যানেজার। তিনি ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। দ্বারভাঙ্গায় তিনি শৈশব কাটান, তাই বাংলা ভাষার তুলনায় হিন্দি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি ১৮৯৫ সালে দ্বারভাঙ্গা রাজ স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং ১৮৯৭ সালে পটনা কলেজ থেকে এফএ পাশ করেন। ফার্স্ট আর্টস পাশ করার পর শ্যামাচরণ দে-র নাতনি মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৮৯৯ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স-সহ বিএ পাশ করেন। তখনও এমএসসি কোর্স চালু না হওয়ায় ১৯০০ সালে রসায়নে এমএ পরীক্ষা দেন এবং প্রথম হন।
১৯০২ সালে কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ (তৎকালে রিপন) কলেজ থেকে বিএল পাশ করে মাত্র তিন দিন ওকালতি করেন। বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী হওয়ায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা করেন। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি। ১৯০৩ সালে রাজশেখর সেখানে চাকরি শুরু করেন। সেখানে তিনি একজন রাসায়নিক হিসাবে সামান্য বেতনে নিযুক্ত হন। নিজ দক্ষতায় অল্পদিনেই তিনি প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও তৎকালীন ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. কার্তিক বসুরপ্রিয়পাত্র হয়ে যান। ১৯০৪ সালে তিনি কোম্পানির পরিচালক পদে উন্নীত হন। একদিকে গবেষণার কাজ, অন্যদিকে ব্যবসা পরিচালনা, দুই ক্ষেত্রেই তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। কেমিস্ট্রি ও ফিজিওলজির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে তিনি এক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। স্বাস্থ্যহানির কারণে সেখান থেকে অবসর নিলেও উপদেষ্টা এবং পরিচালক পদে আমৃত্যু ওই কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিয়মানুবর্তিতা ও সুশৃঙ্খল জীবনাচরণ তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। ১৯০৬ সালে ভারতে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠিত হলে তিনি তাতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
রাজশেখর বসুর সাহিত্যিক জীবন শুরু হয় গত শতকের দুইয়ের দশকে। ১৯২২ সালে ‘পরশুরাম’ ছদ্মনামে তিনি একটি মাসিক পত্রিকায় ‘শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড’ নামে ব্যঙ্গরচনা প্রকাশ করেন। সেখানে অনেকগুলি হাস্যরসাত্মক গল্প প্রকাশ করেন, যা তাঁকে প্রভূত জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। শনিবারের চিঠি পত্রিকাতেও তিনি নিয়মিত লিখেছেন। গল্পরচনা ছাড়াও তাঁর স্বনামে প্রকাশিত কালিদাসের মেঘদূত, বাল্মীকি রামায়ণ (সারানুবাদ), কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসকৃত মহাভারত (সারানুবাদ), শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ইত্যাদি ভারতীয় ধ্রুপদী সাহিত্যের অনুবাদগ্রন্থগুলিও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। তাঁর গল্পের ছবি আঁকতেন কার্টুনিস্ট যতীন্দ্রকুমার সেন। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় রাজশেখর বসু রচিত বাংলা অভিধান চলন্তিকা। এগুলি ছাড়াও লঘুগুরু, বিচিন্তা, ভারতের খনিজ, কুটির শিল্প প্রভৃতি প্রবন্ধগ্রন্থও তিনি লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা মোট ২১।
১৯৫৫ সালে কৃষ্ণকলি ইত্যাদি গল্প গ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত করে।আনন্দীবাঈ ইত্যাদি গল্প বইয়ের জন্য তিনি ১৯৫৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত বানান সংস্কার সমিতি ও ১৯৪৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিভাষা সংসদের সভাপতিত্বও করেন রাজশেখর। ১৯৫৭-’৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষে ডি.লিট উপাধি পান তিনি। এছাড়াও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধি প্রদান করে। ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ উপাধি দেয়। ১৯৪০ সালে জগত্তারিণী পদক এবং ১৯৫৫ সালে সরোজিনী পদক পান রাজশেখর।
সত্যজিৎ রায় রাজশেখর বসুর ছোটগল্প ‘পরশপাথর’ ও ‘মহাপুরুষ’ অবলম্বনে দু’টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। রাজশেখরের এক কন্যা ছিলেন। জামাই খুব অল্প বয়সে অসুস্থতার কারণে মারা গেলে শোকার্ত হয়ে মেয়েও একই দিনে মারা যান। ১৯৪২ সালে তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবী মারা যান। পরে ১৮ বছর বিপত্নীক রাজশেখর নিঃসঙ্গ জীবনেও অমূল্য সাহিত্য রচনা করেন। ব্যক্তিগত দুঃখের কথা তাঁর লেখনীতে পাওয়া যায়নি। ১৯৫৯ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি লেখালেখি চালিয়ে যেতে থাকেন। শেষে ১৯৬০ সালের ২৭ এপ্রিল দ্বিতীয়বার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
