Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

রামায়ণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমত

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোষ

পৃথিবীতে আদি মহাকাব্য আছে চারটি, রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড ও ওডিসি। প্রথম দু’টি সংস্কৃত এবং অন্য দু’টি গ্রিক ভাষায় রচিত। আদি মহাকাব্য বলতে বোঝায়, যা সম্পূর্ণ নিজস্ব, কারও থেকে ধার করা নয়। বাকি যত মহাকাব্য আছে, সেগুলি সব পূর্বে লিখিত কোনও না কোনও কাব্য বা পুরাণ কিংবা লোককথা থেকে রচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো রামায়ণ। রাশি, নক্ষত্র ও অন্যান্য নিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে ও পরোক্ষ কিছু তুলনামূলক পর্যালোচনা করে জানা গিয়েছে, এটি প্রায় ৬ হাজার বছর আগের। ভবিষ্যতে অন্য কোনও প্রমাণ পাওয়া যেতেও পারে। তার পর মহাভারত। এটি মোটামুটি ৫১০১ বছর আগেকার। এ ক্ষেত্রেও নিরন্তর গবেষণা চলছে। আর ইলিয়াড ও ওডিসি প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরোনো।

আয়তনে মহাভারত সবচেয়ে বড়। তার পরে রামায়ণ, ইলিয়াড ও ওডিসি। তবে জনপ্রিয়তায় শীর্ষে আছে রামায়ণ। মহাভারতের কাহিনি অনেক বেশি জটিল। এখানে মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি ও ধর্মীয় বিশ্লেষণ অনেক গভীর। তুলনায় রামায়ণ আমাদের যেন পারিবারিক বিষয়। বোধ হয় এর সহজ আবেদন সাধারণ মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করে।

ভারতের সব ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে রামায়ণের জনপ্রিয়তা ব্যাপক। এটা যারা পড়েনি, তারা বুঝবে না। সব ভাষায় রামায়ণের সংস্করণ আছে। ভারতের বাইরে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশে রামায়ণ তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে লেখা।

আগে রামায়ণ-মহাভারতকে ইতিহাস বলা হত। তখনও মহাকাব্য শব্দ চালু ছিল না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‍‘‍এখন বিদেশীয় সাহিত্য ভাণ্ডারে যাচাই করিয়া তাহাদের নাম দেওয়া হইয়াছে এপিক।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‍‘আর এক শ্রেণীর কবি আছে, যাহার রচনার ভিতর দিয়া একটি সমগ্র দেশ, একটি সমগ্র যুগ, আপনার হৃদয়কে, আপনার অভিজ্ঞতাকে ব্যক্ত করিয়া তাহাকে মানবের চিরন্তন সামগ্রী করিয়া তোলে।’ রামায়ণের আদর্শ নিরূপণ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‍‘রামায়ণে যে রস সর্বাপেক্ষা প্রাধান্য লাভ করিয়াছে, তাহা বীররস নহে।’ তিনি একটু পরে লিখেছেন, ‍‘দেবতার অবতারলীলা লইয়াই যে এ কাব্য রচিত, তাহাও নহে। কবি বাল্মিকীর কাছে রাম অবতার ছিলেন না, তিনি মানুষই ছিলেন,  পণ্ডিতরা ইহা প্রমাণ করিবেন। এই ভূমিকায় পাণ্ডিত্যের অবকাশ নাই; এখানে এইটুকু সংক্ষেপে বলিতেছি যে, কবি যদি রামায়ণে নরচরিত্র বর্ণনা না করিয়া দেবচরিত্র বর্ণনা করিতেন, তবে তাহাতে রামায়ণের গৌরব হ্রাস হইত। সুতরাং তাহা কাব্যাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হইত। মানুষ বলিয়াই রামচরিত্র মহিমান্বিত।’

রবীন্দ্রনাথ নারদের উক্তি উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ‍‘এত গুণযুক্ত পুরুষ তো দেবতাদের মধ্যেও দেখি না। তবে যে নরচন্দ্রমার মধ্যে এই সকল গুণ আছে, তাঁহার কথা শোনো। রামায়ণ সেই নরচন্দ্রমারই কথা, দেবতার কথা নহে। রামায়ণে দেবতা নিজেকে খর্ব করিয়া মানুষ করেন নাই, মানুষই নিজগুণে দেবতা হইয়া উঠিয়াছেন।’

রবীন্দ্রনাথ অভিমত দিয়েছেন যে, রামায়ণের বিশেষত্ব এই যে, তা ঘরের কথাকেই অত্যন্ত বড় করে দেখিয়েছে। পিতা পুত্রে, ভাইয়ে ভাইয়ে, স্বামী স্ত্রীতে যে ধর্মের বন্ধন, যে প্রীতি-ভক্তির সম্বন্ধ, রামায়ণ তাকে এত মহৎ করে তুলেছে যে, তা অতি সহজেই মহাকাব্যের উপযুক্ত হয়েছে। দেশ জয়, শত্রু বিনাশ, দুই প্রবল বিরোধী পক্ষের প্রচণ্ড আঘাত-সংঘাত, এ সমস্ত বিষয়ই সাধারণ মহাকাব্যের মধ্যে আন্দোলন ও উদ্দীপনার সঞ্চার করে। তিনি মনে করেন যে, রামায়ণের মহিমা রাম-রাবণের যুদ্ধকে আশ্রয় করে দাঁড়িয়ে নেই। সে যুদ্ধ রাম ও সীতার দাম্পত্যপ্রীতিকেই উজ্জ্বল করে দেখানোর উপায় মাত্র। গৃহাশ্রম ভারতীয় আর্যসমাজের ভিত্তি। রামায়ণ সেই গৃহাশ্রমের কাব্য। কৈকেয়ী–মন্থরা কুচক্রান্তের কঠিন আঘাতে অযোধ্যার রাজগৃহে ভাঙন ধরাতে চেয়েও পারেননি। রামায়ণ কেবল মাথায় নয়, হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। রামায়ণ অখণ্ড অমৃত পিপাসুদেরই পরিচয় বহন করছে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए