Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

প্রতুল মুখোপাধ্যায় দিয়ে গেলেন গণসংগীতের অমূল্য সম্পদ

তিনি মনে করতেন, গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। তাই তাঁর গান হয়ে উঠেছিল বিপ্লবের ভাষা, প্রতিবাদের অস্ত্র।

Share Links:

কাজল মুখার্জি

বাংলার গণসংগীতের ইতিহাসে যে ক’জন শিল্পী চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, তাঁদের মধ্যে প্রতুল মুখোপাধ্যায় অন্যতম। তিনি ছিলেন এক বিরল প্রতিভার অধিকারী, যাঁর গান কেবল সংগীতের মধুর রস আস্বাদন করায়নি, বরং সময়ের চেতনাকে জাগ্রত করেছে, মানুষের অধিকার ও সংগ্রামের ভাষা হয়ে উঠেছে। তাঁর কণ্ঠে প্রতিটি গান যেন বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন, প্রতিবাদের বজ্রনিনাদ।

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৫ জুন। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। তবে মূলধারার গান বা জনপ্রিয় চলচ্চিত্র সংগীতের বদলে তিনি গণসংগীতের পথ বেছে নেন। ছেলেবেলা থেকে শ্রমিক আন্দোলন, বামপন্থী রাজনীতি এবং সমাজের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সহানুভূতি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে গানের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।

গত শতকরে ছয় ও সাতের দশকের অগ্নিগর্ভ সময়ে, যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আবহ উত্তাল, তখন গণসংগীত নতুনভাবে বিকশিত হয়। সে সময়েই প্রতুল মুখোপাধ্যায় তাঁর সংগীত জীবন শুরু করেন। তিনি মনে করতেন, গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। তাই তাঁর গান হয়ে উঠেছিল বিপ্লবের ভাষা, প্রতিবাদের অস্ত্র।

প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে মনে পড়লেই যে গানের কথা প্রথমেই উঠে আসে, তা হল, ‍‘আমি বাংলায় গান গাই’। এ গান কেবল সংগীতপ্রেমীদের কাছে নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির এক অমূল্য সম্পদ। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন যখন উঠেছিল, তখন এ গান যেন বাঙালির অস্তিত্বের শপথ হয়ে ওঠে।

‘আমি বাংলায় গান গাই,
আমি বাংলার গান গাই।
আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই।’
এ গানের মধ্যে আছে এক অসাধারণ আবেগ, যা বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসাকে সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। এটি বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, যা আজও সমান জনপ্রিয়।

শুধু ‍‘আমি বাংলায় গান গাই’ নয়, তাঁর কণ্ঠে আরও বহু গান বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর গাওয়া ও রচিত কয়েকটি বিখ্যাত গানের বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। ‘পৃথিবী যাবে চলে’— এ গানটি জীবনের অনিত্যতা ও সময়ের গতিকে তুলে ধরে। গানটির ভাবার্থ বেশ দার্শনিক। জগৎ পরিবর্তনশীল, সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। ‍‘কালবৈশাখী’— বাংলার আবহাওয়ার এক বিশেষ দিক। বৈশাখ মাসের ঝড়বৃষ্টি নিয়ে লেখা এ গানটি প্রকৃতির রূঢ় বাস্তবতার এক প্রতিচিত্র। ‍‘এই পৃথিবী যেমন আছে, তেমনই রবে’— এ গানের মাধ্যমে শিল্পী গেয়েছেন, মানুষ আসবে যাবে, কিন্তু পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে চলতে থাকবে। ‍‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’— বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা এ গানটি বাংলার দুই ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে একাত্মতা ও আবেগের কথা বলে। ‍‘জোর করে ভালোবাসা যায় না’— এ গানটি প্রেমের এক গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। ভালোবাসা কখনও জোর করে হয় না, এটি হৃদয়ের গভীর অনুভূতির ফল।

প্রতুল মুখোপাধ্যায় শুধু একজন গায়ক নয়, ছিলেন সংগ্রামী শিল্পী। তিনি সংগীতকে ব্যবহার করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের জন্য। তাঁর গানে ছিল সমাজের বাস্তব চিত্র, শোষিত মানুষের যন্ত্রণা, বিদ্রোহের ডাক। গণসংগীতের ধারায় তিনি ছিলেন এক অনন্য শিল্পী, যিনি বাংলার লোকগান, বাউল এবং আধুনিক সংগীতের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠে লোকসংগীতের ছোঁয়া যেমন ছিল, তেমন আধুনিক গানের মাধুর্যও ছিল। সারাজীবন তিনি গণসংগীতের প্রচার ও প্রসারের জন্য কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংগীতের মাধ্যমে মানুষের চেতনা জাগ্রত করা সম্ভব। তাই তাঁর গান ছিল মানুষের কাছে সহজবোধ্য, কিন্তু গভীর ভাবসম্পন্ন।

প্রতুল মুখোপাধ্যায় শুধু একজন গায়ক নন, তিনি একাধারে দক্ষ গীতিকার ও সুরকারও ছিলেন। তাঁর গাওয়া গানগুলির অনেকগুলিই ছিল নিজের লেখা ও সুরারোপিত, যা গণসংগীতের ক্ষেত্রে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

প্রতুল মুখোপাধ্যায় থিয়েটারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। নাটকের আবহসংগীত ও গণসংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে তিনি থিয়েটার আন্দোলনের অংশ হয়েছিলেন। তিনি শ্রমিক আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন এবং মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর গান বিভিন্ন প্রতিবাদী সমাবেশ, রাজনৈতিক মিছিল এবং শ্রমিকদের সম্মেলনে বিপ্লবের গান হিসাবে গাওয়া হত।

১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা সংগীত জগতের এক শোকের দিন। এদিন চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠ। কিন্তু শিল্পীরা কখনওই হারিয়ে যান না, সৃষ্টি তাঁদের চিরকাল জীবিত রাখে।

প্রতুল মুখোপাধ্যায় আমাদের দিয়ে গেলেন বাংলা গণসংগীতের অমূল্য সম্পদ। তাঁর গান আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে, প্রতিবাদের ভাষা দেয়। তিনি চলে গেলেও তাঁর গান চিরকাল আমাদের মনে অম্লান থাকবে। তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए