সুদীপনারায়ণ ঘোষ

সম্প্রতি ভারতের পহেলগামে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের সদস্যরা ২৬ জন নিরীহ হিন্দু পর্যটককে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। রেহাই পাওয়া লোকরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, পাকিস্তান প্রণোদিত জেহাদিরা হিন্দু পর্যটকদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিশানা করেছিল, তাদের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করে কলমা পাঠের হুকুম দিয়েছিল এবং পুরুষ পর্যটকদের খৎনা পরীক্ষা করার জন্য তাঁদের প্যান্ট খুলে ফেলতে বাধ্য করেছিল, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে, কেবল হিন্দুরাই তাদের হাতে নিহত হচ্ছেন।
তবু কংগ্রেস ও অন্য বিরোধীরা এই হামলার প্রকৃত হিন্দুবিরোধী চরিত্রকে লঘু করছে। সংখ্যালঘু তোষক নেতারা মুসলমানদেরই উলটে শিকার হিসাবে দেখাচ্ছেন। ভারতের ছদ্ম সেকুলাররা বলেন, সন্ত্রাসবাদের কোনও ধর্ম নেই। তাঁদের মতে, মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে ‘ভয়’ হঠাৎ বেড়ে যায়, যখন হিন্দুরা হিন্দু হওয়ার কারণে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের দ্বারা খুন হওয়ার সমালোচনা করেন।
কংগ্রেসের সইফুদ্দিন বলেছেন, ‘পাকিস্তানের কাছে সেচ ও পানীয় জল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর জল না আটকালে পঞ্জাব, জম্মু-কাশ্মীর সম্পূর্ণ ডুবে যাবে। সিন্ধু জল চুক্তি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের পরেও বজায় আছে। এটা পাকিস্তানের জীবনরেখা। পাকিস্তান যদি বলে, তারা পহেলগাম হামলায় জড়িত নয়, তাহলে ভারতের সে কথা মেনে নেওয়া উচিত।’
মহারাষ্ট্র কংগ্রেসের ওয়াদেত্তিওয়ার বলেছেন, ‘সরকার বলছে যে, সন্ত্রাসবাদীরা ধর্ম জিজ্ঞাসা করেই হত্যা করেছে। সন্ত্রাসবাদীদের কি এসবের সময় আছে?’ তিনি ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যকে সন্দেহ করে ভোটব্যাংকের দিকে লক্ষ রেখে বলেছেন, ‘সন্ত্রাসবাদীদের কোনও জাত বা ধর্ম নেই। যারা দায়ী, তাদের ধরুন, ব্যবস্থা নিন। এটাই দেশের অনুভূতি।’
কংগ্রেসের মণিশঙ্কর আইয়ার হামলায় পাকিস্তানকে ক্লিনচিট দিয়ে বলেছেন, দেশ ভাগের অমীমাংসিত সমস্যাগুলিই এই সন্ত্রাসবাদী হামলার কারণ। কর্ণাটকের কংগ্রেস মন্ত্রী থিম্মাপুর পহেলগাম হামলার সময় ইসলামি সন্ত্রাসবাদীদের হিন্দু ভুক্তভোগীদের ধর্ম জিজ্ঞেস করার বিষয়টি লঘু করে বলেছেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না যে, আক্রমণকারীরা পর্যটকদের নাম এবং ধর্ম জিজ্ঞাসা করেছিল। গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঢাকতে ধর্মীয় রং লাগানো হচ্ছে।’ তিনি মুসলিম ভোটারদের তুষ্ট করতে জীবিত ব্যক্তিদের সাক্ষ্যকে অপমান করে তাঁর ব্যক্তিগত মত দিয়ে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এই জঘন্য অপরাধকেও ঢাকতে মরিয়া।
কর্ণাটকের কংগ্রেস নেতা এম লক্ষ্মণ মোদি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনীতিকরণের অভিযোগ তুলে দাবি করেছেন, মুসলিমদেরও হত্যা করা হয়েছে এবং তাঁর দলীয় নেতাদের মতো বলেছেন, কেন্দ্র পহেলগাম হামলাকে ধর্মীয় রং লাগাচ্ছে। এটা ধর্মনিরপেক্ষ সন্ত্রাসবাদী হামলা। পর্যটকদের বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের হাতে সৈয়দ হুসেনশাহ নামে একজন মুসলিম নিহত হন, তবে তিনি হিন্দু পর্যটকদের মতো জেহাদিদের মুখোমুখি হননি।
রবার্ট বঢরা হামলার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, বর্তমান সরকারের হিন্দুত্ববাদী নীতিই হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে এই হামলা ঘটিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর কংগ্রেসের জেপিসিসি নেতা তারিক আহমেদ কারা পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে, যদিও পাকিস্তান সীমান্ত পার থেকে ইসলামি সন্ত্রাসবাদে মদত দিয়েছে এবং বারবার ভারতের বিরুদ্ধে পারমাণবিক বোমার হুমকি দিয়ে চলেছে। তিনি বলেছেন, ভারতের উচিত পাকিস্তানের সঙ্গে জলযুদ্ধ এড়িয়ে বিরোধ সমাধানে আলোচনা শুরু করা। ভারত ও পাকিস্তানের মাথা ঠান্ডা রাখা উচিত।
কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া বলেছেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের কোনও প্রয়োজন নেই। আমরা যুদ্ধের পক্ষে নই। আমাদের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত এবং আমাদের নিরাপত্তা জোরদার করা উচিত।’ পাকিস্তানি মিডিয়া তাঁর বক্তব্য ব্যবহার করে ভারত সরকারকে আক্রমণ করছে। বিবৃতিটি পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। তারা একে ব্যাপক কাজে লাগিয়ে দাবি করেছে, ভারতের ভিতরেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছে। এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হওয়ায় সিদ্দারামাইয়া অজুহাত দেখান, কিন্তু ততদিনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। ক্ষোভের মুখে কংগ্রেস নেতৃত্ব সদস্যদের সতর্ক করে দলীয় লাইন অনুসরণ করতে বলেছে। কংগ্রেস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত সরকার যে কোনও পদক্ষেপ নিলে তারা পাশে থাকবে।
অন্যান্য দলের নেতারা পাকিস্তানের আখ্যানকে তোতাপাখির মতো আউড়ে কংগ্রেস নেতাদের দলে যোগ দিয়েছেন। টিএমসির মর্জিনা খাতুন বলেছেন, ‘নতুন ওয়াকফ আইন থেকে চোখ ঘোরাতে বিজেপি এই হামলা চালিয়েছে। বিজেপি সন্ত্রাসবাদীদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়। এ কারণেই সেখানে কোনও সেনা সদস্য ছিলেন না। বিহারে নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছে। এ কারণেই বিজেপি সাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈরি করছে।’
সিপিএমের সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘হিন্দুরা কাশ্মীরি সেজে এ কাজ করেছেন।’ বিমান বসু বলেছেন, ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।’
বিজেডি সাংসদ সুজাতা দেও বলেছেন, ‘যত লোক মারা গিয়েছেন, তাঁদের মারতে যত সময় লেগেছে, তার মধ্যে ধর্ম জিজ্ঞাসা করা বা পরীক্ষা করা মোটেও সম্ভব নয়। এ সবই অনুমান। কোনও সন্ত্রাসবাদী কখনও কারও ধর্ম জিজ্ঞাসা করে না। তারা কখনও ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয় না।’
এই সন্ত্রাসবাদী হামলাকে ইসলামি সন্ত্রাসবাদ বলা কি জরুরি? মানুষ নির্বোধ নয় যে, সমস্ত মুসলিমকে দোষারোপ করবে। অমুসলিমরা, বিশেষত হিন্দুরা কোনওভাবে মুসলিম সম্প্রদায়কে অপবাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্রও করছে না। নিরাপত্তায় ত্রুটি ছিল বলে সন্ত্রাসবাদী হামলার ধর্মীয় প্রকৃতি অস্বীকার করা যায় না। বাস্তব হল, ওরা মনে করে, অমুসলিমদের মধ্যে নিকৃষ্ট হলেন হিন্দুরা। পহেলগামের সন্ত্রাসবাদের মূলে ছিল হিন্দুদের প্রতি অপরিসীম ইসলামপন্থী ঘৃণা। ভূ-রাজনৈতিক কারণ যাই হোক, মূল সমস্যা ধর্মীয় পার্থক্য। ভারত ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়েছিল। দেশ ভাগের পর সাত দশকের বেশি সময় কেটেছে। এর পরেও পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনির হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয় পার্থক্যকে ভারতের বিভাজন এবং পাকিস্তান তৈরির নির্দিষ্ট কারণ হিসাবে দেখেন। ভারতের প্রতি পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানগুলির এই হিংস্র মনোভাবের মূলে রয়েছে হিন্দুদের এবং পাশাপাশি অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা।
সমস্ত পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আসলে সশস্ত্র জেহাদি গোষ্ঠী, যারা অমুসলিমদের ওপর ইসলামি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইসলামি ধর্মতত্ত্বে বিশ্বাসী। ইসলামি সন্ত্রাসবাদীরা আঞ্চলিক বা জাতীয় ঘৃণা দ্বারা চালিত নয়। তাদের একমাত্র প্রেরণা হল কাফের হিন্দু ও তাঁদের দার-উল-হারবের প্রতি ঘৃণা। বুঝতে হবে যে, ঘৃণার উৎস ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শ। সন্ত্রাসবাদের ধর্ম আছে বলতে হবে, কারণ জেহাদিরা দু’ডজনের বেশি হিন্দু পর্যটককে ধর্ম জেনে গুলি করেছে, একজন খ্রিস্টানকে কলমা না পরার জন্য মারে।
সন্ত্রাসবাদ শেষ হবে না, যতক্ষণ না আমরা ঘৃণার উৎসকে স্বীকার করি, যা মুসলিম না হওয়ার জন্য অমুসলিমদের হত্যা করতে এবং যথেষ্ট মুসলিম না হওয়ার জন্য মুসলমানদের হত্যা করতে জেহাদিদের প্ররোচনা দেয়।
