শিশির আজম (বাংলাদেশ)

পল ক্লি তাঁর ছবিটির নামকরণ করেছেন ‘Ask Yourself’. সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘নিজেকে জানো’। রেনেসাঁ পুরুষ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বা রবীন্দ্রনাথের যে আত্মপ্রতিকৃতিসমূহ, তা কি নিজেকে দেখতে চাওয়ার আকুতিরই জানান দেয় না? এমনকী সেজান, মিরো বা কিবরিয়ার যে ‘জড়জীবন’, তাও কি কোনও না কোনওভাবে নিজের অবস্থান-ভাবনা-অনুভূতির সারাৎসার হয়ে দাঁড়ায় না? রামকিংকর বেইজ যে সাঁওতাল দম্পতিকে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছেন, তা তো ওর ভিতরের জ্যান্ত অনুভূতিরই প্রকাশ। নয় কি? মানুষ আসলে নিজের ওপর বিরক্ত। তবু সে নিজের কাছেই ফিরতে চায়। কিন্তু তার নিজের ভিতরটা কখনওই তার ভালোভাবে দেখা হয় না। হয়তো নিজের ভিতরে উঁকি মারতে পারাটা বড় সাহসের ব্যাপার অথবা অবহেলা। শিল্পীরা যে অসংখ্য ল্যান্ডস্কেপ আঁকেন, তা তো নিজেকেই বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া। তারপর দূর থেকে নিজেকে দেখা। আর সবার দেখা তো এক নয়। বাংলার চিরায়ত প্রকৃতিকে আমাদের সব শিল্পীই এঁকেছেন। তবু তাঁদের দেখায়, অনুভবে, উপস্থাপনায় কত অমিল! নন্দলালে, সফিউদ্দিনে পাইনে কত ভিন্নতা রয়েছে? একই ‘যমুনা কে তীর’ আবদুল করিম খাঁ আর ভীমসেন যোশির গলায় আলাদা আলাদা ইমেজের স্ফূরণ ঘটায়। এমনটাই হওয়ার কথা। মা তো মা-ই। তবু গোর্কির মা আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মায়ের যুগের দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনাচরণে প্রভেদ রয়েছে। যুগে যুগে জাপানি চিত্রীরা কতভাবেই না ফুজি পর্বতকে দেখেছেন। এক হোকুসাই-ই (১৭৬০-১৮৪৯) কতভাবে ফুজিকে যে দেখেছেন। ওঁর Thirty six Views of Mount Fuji (১৮৩০-১৮৩২) আমাদের বিস্মিত করে। জাপানি এসব Mountscape আর ধ্রুপদী ছাপচিত্রের ভিতর যেন কী এক মহাজাগতিক ঐক্য আমরা অনুভব করি। এটা কীভাবে সম্ভব? আসলে এটাই হওয়ার কথা। কেউ যখন অন্য কিছু দেখে, সে নিজেকেই দেখে। এ কারণে একজনের দেখার সঙ্গে আর একজনের দেখায় এত বৈচিত্র। আর এখানেই যাপিত জীবন ও শিল্পেন সম্মিলন। মানুষ কিন্তু তার যাপিত জীবনের বেশিরভাগ সময়টাতেই নিজেকে ভুলে থাকে। অথচ ভাবে, সে নিজের জন্যই ব্যস্ত। সে একমুহূর্ত নিজের দিকে তাকানোর ফুরসত পায় না। নিজের দিকে তাকাতে সে ভীতও। কেন ভীত, এ প্রশ্ন সে করে। নিজেকে। এই মুহূর্তটা প্রত্যেকের জীবনে খব কম আসে। কিন্তু এর চেয়ে দরকারি মুহূর্তও তো আর নেই। পল ক্লি-র এই ছবিতে এরকম অসাধারণ একমুহূর্ত ধরা পড়েছে। এটাকে কি মুহূর্ত বলা ঠিক হবে?
পলের কাজে সব সময় সুক্ষ্ম রেখা আর ডটের ব্যবহার সহায়ক। একটুকরো সাদা কাগজই যথেষ্ট। একটি রেখা বা বিন্দুকে ওর উপর স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিলেই একটি ছবি হয়ে যাবে। পলের কাজ এমনই। সাধারণ এবং খুবই অসাধারণ।
