অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

২০২০-’২১ সাল করোনা অতিমারির কাল হিসাবে চিহ্নিত। এই মহামারিতে সারাবিশ্বে কয়েক লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছে। ভারতেও ৪,৮১,০০০ মানুষ মারা গিয়েছে বলে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে। তার পর থেকে আমাদের জনজীবনে এসেছে বড় পরিবর্তন। বহু মানুষ কাজ হারিয়েছে, বহু মানুষের জীবিকার পরিবর্তন হয়েছে। আর গ্রামগঞ্জ, মফস্বল শহরে সবচেয়ে বেশি যেটা দেখা গিয়েছে, তা হল, বহু মানুষ খাবারের দোকান খুলেছে। তার মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণভাবে ফাস্ট ফুডের দোকান অলিতে-গলিতে তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাসে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। কিশোর-কশোরী থেকে শুরু করে পরিবারের সকলেই ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। এর অবধারিত ফলই হচ্ছে স্থূলত্ব।
আগে মানুষ বাড়িতে রান্না করা খাদ্যে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু এখন অভিভাবকরা স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের জন্যও বাজার থেকে কেনা প্যাকেটজাত খাবার টিফিন হিসাবে দিয়ে দিচ্ছেন। ফলে শিশুরাও অতিরিক্ত ওজনজনিত সমস্যায় ভুগছে। এর সঙ্গে রয়েছে কম পরিশ্রম করে আয়েসি জীবনযাপন।
বিজ্ঞানের শ্রম লাঘব যন্ত্র আবিষ্কার একদিকে যেমন মানুষের শ্রম লাঘব করছে, অন্যদিকে তাদের হাত এসেছে অফুরন্ত সময়। এই সময়ে মানুষ আর আগের মতো খেলাধুলো করে কাটায় না। পুকুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটে না। তাদের ঘরে টিভি আর হাতে স্মার্টফোন রয়েছে। স্মার্টফোন বিনোদনের জন্য সবার কাছে অতি জনপ্রিয় একটি মাধ্যম।
খাদ্যাভ্যাসে ফাস্ট ফুডের দাদাগিরি সাধারণ মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে কম পরিশ্রমজনিত অনেক রোগের সমস্যা। তাদের মধ্যে অন্যতম হল স্থূলতা। দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রমের অনুপাতে দেহে খাদ্যের মাধ্যমে সংগৃহীত ক্যালোরির পরিমাণ বেশি হলে অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে চর্বি হিসাবে জমতে থাকে। ফলে দেহ মোটা হয় ও দেহের ওজন বেড়ে যায়। দেহের এই অবস্থাকে স্থূলতা বলে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের শরীরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চর্বি বা ফ্যাট থাকে (পুরুষদের ১৫% এবং মহিলাদের ২৫%)। স্বাভাবিকের চেয়ে ৫% বা তার বেশি চর্বি থাকলে তাকে স্থূলতা বলে। সাধারণত যে কোনও ব্যক্তির স্থূলতা জানা যায় দেহভর সূচকের মাধ্যমে, যাকে ইংরেজি পরিভাষায় Body Mass Index বা সংক্ষেপে BMI বলে। দেহভর সূচকের একটি স্বাভাবিক নির্দেশক মান আছে, তা হল, ১৮.৫ থেকে ২৪.৯। এর মধ্যে ব্যক্তির দেহভর সূচক থাকলে তাকে স্বাভাবিক বলা হয়। এই মান এর নীচে গেলে তাকে রুগ্ন হিসাবে গণ্য করা হয়। আর দেহভর সূচকের মান স্বাভাবিক মানের (২৫.০ থেকে ২৯.৯) উপরে গেলে অতিরিক্ত ওজন বলা হয়। এরপর শুরু হচ্ছে স্থূলতা।
স্থূলতাকে আবার তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। দেহভর সূচকের মাণদণ্ডে প্রথম শ্রেণির স্থূলতা ৩০.০ থেকে ৩৪.৯, দ্বিতীয় শ্রেণির স্থূলতা ৩৫.০ থেকে ৩৯.৯ এবং তৃতীয় শ্রেণির স্থূলতা ৪০ বা তার চেয়ে বেশি। এই মান ৪০ হলে তাকে স্থূলতার চরম পর্যায় ধরা হয়। বয়স অনুযায়ী এই মানের পার্থক্য হয়।
স্থূলতা পৃথিবীতে বর্তমানে একটি ভয়াবহ রোগ হিসাবে দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি পৃথিবী বিখ্যাত একটি মেডিক্যাল জার্নাল ‘দি ল্যানসেট’ মেডিক্যাল জার্নালের গত ৪ মার্চ প্রকাশিত তথ্য মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ১৯৯০ সালে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯২.৯ কোটি, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬০ কোটি। দি ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ভারতে যেখানে মাত্র ২০ শতাংশ তরুণ ফাস্ট ফুড খেত, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ শতাংশেরও বেশি। এই পরিসংখ্যান কি আগামী দিনের জন্য অশনিসংকেত নয়? তাই সচেতন না হলে তার কী পরিণাম হতে পারে, একবার ভেবে দেখুন। স্থূলতা শুধু যে ৪০-ঊর্ধ্ব মানুষের মধ্যে দেখা যায়, তা নয় কিন্তু। বর্তমানে শিশুরাও স্থূলতায় ভুগছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে বয়স্ক মানুষের মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যার ৬০ শতাংশে স্থূলতা দেখা যাবে। আর শিশু বা কিশোর কিশোরীও এ বিপদের বাইরে নয়।
এবার আসি আমাদের দেশের কথায়। দি ল্যানসেট পত্রিকায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি তিনজন ভারতীয়ের মধ্যে একজন স্থূল হয়ে পড়বেন। কারণ গত ১০-১৫ বছরে ভারতীয়দের মধ্যে খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রায় এসেছে বড় পরিবর্তন। একসময় আমাদের মা-ঠাকুমাদের তৈরি বিভিন্ন খাবার খেয়ে বড় হয়েছি। তখনকার দিনে আমরা ঘরে রান্না করা ডাল-ভাত, মাছ-মাংস খেয়েই বড় হয়েছি। আমাদের খাদ্যের মধ্যে ছিল দই-মুড়ি, দই-খই, দই-চিড়ে ইত্যাদি রকমারি পুষ্টিকর এবং লোভনীয় খাবার। এখনকার প্রজন্ম তো সে সব নামই জানে না। একটি তিন বছরের স্কুল পড়ুয়া চেনে পিৎজা, চিপস-সহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক চটকদার খাবার। আর এ সব খাদ্য শিশু বয়স থেকে অভ্যাসের ফলে বড় হয়ে এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফাস্ট ফুড। এর অবধারিত ফলই হচ্ছে স্থূলতা।
স্থূলতা একটি অতি পুষ্টিজনিত রোগ। অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ এবং বেশি ক্যালোরি খাদ্যের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ। আমাদের দেশে যেখানে এখনও বহু মানুষ দু’বেলা পেটপুরে খেতে পায় না, সেখানে অন্যদিকে একশ্রেণির মানুষ অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ করে স্থূলতার শিকার। এটা চরম বৈপরীত্য নয় কি? স্থূলতার কারণে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপে এবং এর ফলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়, রয়েছে ক্যানসারের মতো বিপদও। বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু অনেকটা বাড়লেও স্থূলতাজনিত কারণে তা পাঁচ থেকে দশ বছর কমে যেতে পারে।
বর্তমানে স্থূলতা এক ভয়াবহ রূপ নিতে চলছে। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে এর প্রভাব সামাজিক জীবনে আছড়ে পড়বে। স্থূল মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কম কর্মক্ষম হয়। দেশের উৎপাদনে তার প্রভাব পড়ে। ফলে দেশের অর্থনীতির ওপর একটা চাপ পড়বে।
স্থূলতার মোকাবিলার জন্য আমাদের সকলের খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে। ফাস্ট ফুড এবং জাঙ্ক ফুড ছেড়ে সুষম খাদ্যে ফিরে আসতে হবে। ফিরে আসতে হবে ঘরে বানানো খাদ্যে। না হলে আপনি আপনার অগোচরেই সন্তানের ক্ষতি করে দিয়ে যাচ্ছেন। আর ফিরে যেতে হবে বিকেলে ছেলেমেয়েদের নিয়মিত মাঠে পাঠিয়ে শরীরচর্চা করার অভ্যাসে। পুষ্টিকর খাদ্য এবং নিয়মিত শরীরচর্চাই পারে আগামিদিনের মহামারির আকার ধারণ করতে চলা স্থূলতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে।

খুব সুন্দর লেখা