কাজল মুখার্জি

বাঙালি হিন্দু সমাজে যে ক’টি ষষ্ঠীপুজো প্রচলিত, তার মধ্যে নীলষষ্ঠী একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এটি মূলত সন্তান কামনাকারী বা সন্তানদের মঙ্গলকামনায় মায়েদের ব্রত। উৎসবটি ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি গ্রামীণ সংস্কৃতি, নারী-আস্থা ও মাতৃত্বের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
নীলষষ্ঠী মূলত ষষ্ঠীদেবীর পুজো। তিনি হিন্দু লোকবিশ্বাসে সন্তানের রক্ষক ও জন্মদাত্রী দেবী হিসাবে পরিচিত। লোককথা অনুসারে, ষষ্ঠীদেবী শিশুদের অপদ্রব্য থেকে রক্ষা করেন এবং মাতৃগর্ভে সন্তানের নিরাপদে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করেন। এ ব্রতে ‘নীল’ শব্দটির সংযুক্তি নিয়ে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ বলেন, দেবীর কল্পিত রং নীল, আবার কেউ মনে করেন, এ সময় প্রকৃতি নীলাভ আবরণে আচ্ছন্ন হয়, পলাশ-শিমুল ঝরে যাওয়া বসন্ত শেষে এক প্রশান্ত নীল প্রকৃতিতে নেমে আসে।
নীলষষ্ঠীর দিন সকাল থেকে উপবাস থেকে মায়েরা দেবী ষষ্ঠীর পুজো করেন। অনেক পরিবারে গৃহস্থালির উঠোনে একটি বটের ডাল পুঁতে তার চারদিকে আলপনা দিয়ে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেবীকে পান, সুপারি, চাল, কলা, দুধ, সিঁদুর, দই, ধান, দূর্বা ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। একধরনের নিরামিষ ভোগ রান্না হয়, যার মধ্যে নীলকণ্ঠ শাক এবং ফলমূলের আধিক্য দেখা যায়।
সন্তানবতী মায়েরা ছেলেমেয়েদের সুস্থতা ও দীর্ঘ আয়ুর জন্য এ ব্রত পালন করেন। আবার অনেক নিঃসন্তান নারী সন্তান লাভের আশায় ব্রত নেন। ব্রতের শেষে পরিবারের শিশুসন্তানদের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেন মায়েরা।
নীলষষ্ঠী ঘিরে গ্রামবাংলায় নানা লোকগাথা প্রচলিত। যেমন, একজন গর্ভবতী মা অশুচি অবস্থায় ব্রত পালন না করায় দেবী রুষ্ট হন এবং তাঁর সন্তান বিপদে পড়ে। পরবর্তীতে মা অনুতপ্ত হয়ে দেবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং নিয়মমাফিক পুজো করলে সন্তান রক্ষা পায়। এমন গল্পগুলি মাতৃত্বের গুরুত্ব, নারীর আত্মবলিদান এবং বিশ্বাসের শক্তিকে তুলে ধরে।
সময়ের পরিবর্তনে আজও বহু পরিবারে নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করা হয়। তবে শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় উৎসবের গাম্ভীর্য অনেকটা ক্ষীণ হয়েছে। তা সত্ত্বেও যেসব পরিবারে এ ব্রত পালিত হয়, সেখানে মা ও সন্তানের মধ্যে এক আত্মিক সম্পর্কের প্রকাশ দেখা যায়। বিশেষ করে ঠাকুমা-দিদিমাদের প্রজন্ম থেকে বউমা বা কন্যাদের প্রজন্মে এ ব্রতের রীতিনীতি হস্তান্তর এক সামাজিক ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নীলষষ্ঠী শুধু একটি ধর্মীয় ব্রত নয়, এটি মাতৃত্ব, আশীর্বাদ ও বিশ্বাসের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এ উৎসবের মাধ্যমে বাংলার নারীসমাজ তার জীবনের গভীরতম অনুভূতিকে এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে ব্যক্ত করে। সন্তান প্রতিপালনের এই নিঃশব্দ যুদ্ধের মধ্যে নীলষষ্ঠী এক শান্ত, আধ্যাত্মিক আশ্রয়, যেখানে ঈশ্বর ও মাতৃত্ব একে অপরের হাত ধরেছে।
