অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

তৈরি হত ইতিহাস। রানাঘাটের দু’জন একসঙ্গে হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে ফিরেছেন। দু’জনই এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ালেন। কিন্তু একজন ফেরার পথে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। দুঃখসাগরে নিমজ্জিত রানাঘাটবাসী তথা বাংলার সব মানুষ।
গত ১৭ মে রানাঘাটের দু’জন পর্বতারোহী একসঙ্গে হিমালয় তথা পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে ইতিহাস তৈরি করে। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে নাম ওঠে রানাঘাটের দু’জন বাসিন্দা সুব্রত ঘোষ এবং রুম্পা দাসের। তাঁরা একসঙ্গে জয় করেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ এবং দুর্গম গিরি শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। এই অসাধ্য সাধনের পরের দিনই রানাঘাট তথা সারা বাংলায় বেজে ওঠে বিষাদের সুর। জয় করা হল, ইতিহাসের পাতায় নাম উঠল, কিন্তু ঈশ্বর তাঁকে তা উপভোগ করার সময় দিলেন না। ফেরার পথে প্রতিকূল পরিবেশে হারিয়ে যান সুব্রত ঘোষ। ১৭ ঘণ্টা পর তাঁর বরফাবৃত নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। অন্য মাউন্ট এভারেস্ট জয়ী স্কুল শিক্ষিকা রুম্পা দাস বেস কেম্পে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। রুম্পা দাস রানাঘাটের কুপার্স কলোনি হাইস্কুলের শিক্ষিকা। এর আগে তিনি ছিলেন রানাঘাট দেবনাথ ইনস্টিটিশন ফর গার্লসে কর্তব্যরত। রুম্পা বরাবরই একটু ডানপিটে স্বভাবের এবং অ্যাডভেঞ্চার তাঁর প্রিয়। দু’জনেই ছিলেন কৃষ্ণনগর মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাবের সদস্য। এর আগে রুম্পা দাস ২০২১ সালে এভারেস্ট শৃঙ্গ জয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু করোনার কারণে তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে তাঁর পাহাড় জয়ের অদম্য ইচ্ছা, দৃঢ় মানসিকতা তাঁকে এবারের অভিযানে সাফল্য এনে দিয়েছে। তিনি গর্বিত করেছেন রানাঘাটবাসীকে, অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসকে। তাঁর জন্য সারা বাংলা আজ গর্বিত। কিন্তু এই সাফল্য যে কত কঠিন এবং তাতে যে সব সময় মৃত্যুর হাতছানি থাকে, তা তাঁর সহ-পর্বতারোহী সুব্রত ঘোষের মৃত্যু বুঝিয়ে দিয়েছে। সুব্রত ঘোষ পেশায় স্কুল শিক্ষক। তিনি উত্তর ২৪ পরগনার কাপাসহাটি মিলনবীথি বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক।
সুব্রত ঘোষ এবং রুম্পা দাস গত ৩১ মার্চ এভারেস্ট অভিযান শুরু করেছিলেন। ১৪ মে তাঁরা সামিট পুশে বেরোন। এভারেস্ট শৃঙ্গে প্রথম পৌঁছন রুম্পা দাস। তার কয়েক ঘণ্টা পরে পৌঁছন সুব্রত ঘোষ। ১৫ মে তাঁরা এভারেস্ট জয় করেন।তাঁদের সঙ্গে এবারের যাত্রায় ছিলেন সুব্রতর মামাতো দিদি সুমিত্রা দেবনাথ এবং কৃষ্ণনগরের পর্বতারোহী অসীমকুমার মণ্ডল।
রুম্পা দাস এবং সুব্রত ঘোষের সফল আরোহণের পর রুম্পা ফিরে এলেও ফিরতে পারেননি সুব্রত ঘোষ। জানা গিয়েছে, এভারেস্টের ক্যাম্প ৪ থেকে সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ এভারেস্ট শৃঙ্গে যাওয়ার জন্য একসঙ্গে বেরোনোর কথা থাকলেও ফিলিপিন্সের পর্বতারোহী সানতিয়েগোর জন্য অপেক্ষায় ছিল দল। কিন্তু দুঃসংবাদ আসে যে, সানতিয়েগো মারা গিয়েছে। ফলে দু’ঘণ্টা দেরি হয়ে যায়। তখন প্রায় রাত ৮টা নাগাদ প্রবল হাওয়ার মধ্যে সামিট পুশ শুরু করেন। দলের শেরপা বীরে তামাং কাউকে মুহূর্তের জন্যও দাঁড়াতে দেননি। প্রবল হাওয়ার মধ্যে সামিট পুশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পরদিন (বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টা ৫০ মিনিট নাগাদ এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছে যান। তখন সুব্রত ঘোষ অনেকটা পিছিয়ে যান। রুম্পা দাস এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করে ফেরার সময় হিলারি স্টেপের কাছাকাছি শেষ দেখা হয় সুব্রত ঘোষের সঙ্গে। তখন সুব্রত অনেকটাই সামিটের কাছে পৌঁছে গিয়েছেন। তারপর এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছে ফেরার সময় হিলারি স্টেপ পেরিয়ে আর এগোতে পারেননি সুব্রত। তাঁর সঙ্গী শেরপা অনেক চেষ্টা করেও নামাতে পারেননি। সুব্রতর পাঁচ আঙুলে ফ্রস্টবাইট হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানে দু’টি পথ পর্বতারোহীরা ব্যবহার করেন। একটি পথ নেপাল হয়ে এবং অন্যটি তিব্বত, চিন হয়ে। ভারতীয়দের নেপাল হয়ে যাওয়া সুবিধাজনক। একটি অভিযানে একজনের মোটামুটি খরচ পড়ে ৩২-৩৫ লক্ষ টাকা। সময় লাগে প্রায় দু’মাস।
বাংলা থেকে যাঁরা এভারেস্ট বা অন্য কোনও শৃঙ্গ অভিযানে যান, তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, তাঁদের বেশির ভাগ পর্বতারোহী অভিযানে গিয়ে ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। তবু এটা তাঁদের নেশা।
চন্দননগরের পিয়ালি বসাক আর একজন সফল মহিলা পর্বতারোহী। তিনি পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। এভারেস্ট শৃঙ্গ ছাড়াও একাধিক শৃঙ্গ জয় করেছেন, যেমন রয়েছে রুম্পা দাসের ঝুলিতে। রুম্পা দাস ২০১৫ সালে প্রথম সফল অভিযান করেছিলেন, সেটা ছিল মাউন্ট স্টক কাংড়ি শৃঙ্গ। তার পর একে একে ২০১৬ সালে চ্যাংবা, ২০১৭ সালে ত্রিশূল-১, ২০১৮ সালে সাসের কাংড়ি ও গ্যাংস্টাঙ এবং ২০১৯ সালে দেবাচেন। আর রুম্পা দাসের এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় দ্বিতীয়বারের সফল প্রচেষ্টা।
অন্যদিকে সুব্রত ঘোষ একজন অসামরিক ব্যক্তি হিসাবে ১৯ অক্টোবর, ২০২৪ প্রথম অরুণাচলের গেরিচেন শৃঙ্গ জয় করেছিলেন। এছাড়াও তিনি সফল অভিযান করেছিলেন মাউন্ট রামজ্যাক, মাউন্ট ব্ল্যাকপিক। কিন্তু তিনি আর ফিরে এলেন না রানাঘাটের নিজের বাড়িতে।
