গৌতম মুখোপাধ্যায়
![]()
কবি জীবনানন্দ দাশের মা কুসুমকুমারী দাশ বহুদিন আগে তাঁর ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে,/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?’ তাঁর আন্তরিক ইচ্ছার বাস্তবায়ন হয়েছিল মনমোহন সিং নামক এক ব্যক্তি পঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করায়। ড. মনমোহন ছিলেন অসাধারণ মেধাসম্পদের অধিকারী। ছাত্রাবস্থায় বিভিন্ন পরীক্ষায় তার প্রমাণ রেখেছেন। আবার প্রশাসক হিসাবেও তাঁর কৃতিত্ত্ব অবিস্মরণীয়। ভারতের শিক্ষা প্রশাসন থেকে অর্থ প্রশাসনে তিনি একটি যুগের সূত্রপাত করেন। বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে তিনি স্বমহিমায় ভাস্বর করে তোলেন।
একজন প্রকৃত শিক্ষাবিদ রাজনৈতিক আঙিনাতেও যে সফল হতে পারেন, মনমোহন সিং তার ব্যতিক্রমী উদাহরণ। মুক্তবাণিজ্য নীতি কীভাবে দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষজনের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ গড়ে তুলতে পারে, এ তত্ত্বকে তিনি ভারতের মতো দেশে বাস্তবায়িত করেন। এরই ফলশ্রুতিতে মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পবৃদ্ধির সূচনা হয়েছিল। এর ফলে মেহনতি মানুষের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হয়। ন’য়ের দশকে এই সংস্কার তার যাত্রা শুরু করেছিল বলেই তো ভারত আজ বিশ্বের প্রথম পাঁচ ধনী দেশের তালিকাভুক্ত।
ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রূপান্তরকরণে মনমোহন একজন পথিকৃৎ ছিলেন। উদার অর্থনীতির যথাযথ প্রয়োগে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন এক মাইলস্টোন হিসাবে পরিগণিত হন। নিরহংকার এই মহান পুরুষ ছিলেন একজন মিতভাষী। তিনি কাজে বিশ্বাস করতেন, কথায় নয়। কথাসর্বস্ব রাজনৈতিক কথাকারদের যুগে তাঁর কর্মই হয়ে উঠেছিল যুগের কথা, সংস্কারের কথা। প্রচারসর্বস্ব দুনিয়ায় তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। এজন্য বিরোধীদের ‘মৌনমোহন’ ব্যঙ্গকে তিনি গায়ে মাখেননি। তিনি জানতেন যে, তাঁর বিরোধীরা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে সমালোচনা করলেও আসলে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করে ৯২ বছর বয়সে গত ২৬ ডিসেম্বর পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে একটি যুগের শেষ হল। পরলোকে তিনি শান্তিলাভ করুন। ভারতের ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে এই মর্মে যে, তিনি হলেন সেই ‘ছেলে’, যিনি ‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়’ হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপনে সার্থক হয়েছিলেন।
