সুদীপনারায়ণ ঘোষ

গ্রীষ্মকাল আমের মরশুম। সুন্দর গন্ধ, স্বাদ ও মাধুর্য দিয়ে আম সবাইকে আকৃষ্ট করে। বিশ্বজোড়া তার খ্যাতি। একহাজারেরও বেশি জাতের আম পাওয়া যায়। পৃথিবীর উষ্ণ অঞ্চলে বেলে দোআঁশ মাটিতে আম ভালো হয়। বিখ্যাত সেরা জাতের দশটি আম হল, জাপানের মিয়াজাকি, ভারতের আলফোনসো, পাকিস্তান/ভারতের চৌসা/চৌনসা, ফিলিপাইনসের কারাবাও, মায়ানমারের ডায়মন্ড, মেক্সিকোর আতাউলফো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টমি অ্যাটকিন্স, জ্যামাইকা, ক্যারি হাইল্যান্ডের সেন্ট জুলিয়ান/জুলি ম্যাঙ্গো, থাইল্যান্ডের ন্যাম ডক মাই এবং অস্ট্রেলিয়ার হনি গোল্ড।
পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি মিয়াজাকি আম। জাপানে এটি বিলাসবহুল উপহার হিসাবে গণ্য। চুণীর মতো লাল রং। এক একটি আমের ওজন কমপক্ষে ৩৫০ গ্রাম। ১৫%-এর বেশি চিনি থাকে। জাপানি চাষিরা এ আম ছোট ছোট জালে মোড়েন, যাতে সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছয়। রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রিমিয়াম মানের কারণে এর খরচ বেশি।
বীরভূমের দুবরাজপুরের গৌসিয়া মসজিদের জমিতে আমগাছে ফলন হয়েছে। মসজিদ কমিটির কাজি আবদুল তালেব জানিয়েছেন, ‘আমাদের পাড়ার সৈয়দ নিজামুদ্দিন বছরকয়েক আগে কোথা থেকে আমগাছের চারা মসজিদের মাটিতে পুঁতেছিল। সে একবছর আগে মারা গিয়েছে। কেউ জানে না, সে কোত্থেকে আমচারাটা জোগাড় করেছিল। আগে এই জাতের আমের কথা কেউ জানতও না। কিন্তু এ বছর এর লাল পাকা ফল সকলের নজর কেড়েছে।’ সবসুদ্ধ ন’টি আম ফলেছিল। ২ জুন, ২০২১-এ এরকম একটি আম নিলামে চড়ানো হয়। দুবরাজপুরের এক ছোট ব্যবসায়ী মির্জা ইজাজ বেগ সেটি ১০,৬০০ টাকায় কিনেছেন। প্রতি শুক্রবার কমিটি একটি করে আম বেচবে বলে ঠিক হয়েছে। রাজ্য হর্টিকালচারাল দফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর সমরেন্দ্রনাথ খাঁড়া বলেছেন, ‘এটাই মিয়াজাকি আম। পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি আম। একে সূর্যের ডিমও বলে। রূপ, দাম, ওজন সৌরভ, স্বাদ, সবকিছুর নিরিখে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত জাতের আম। প্রথম মিয়াজাকি আম চাষ করা হয় ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে দক্ষিণ জাপানের কিউশু অঞ্চলের মিয়াজাকিতে। জাপানিতে একে তাইয়ো নো তামাগো বলে।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘জাপানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে এই আমগুলি ২,৭১,০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। ২০১৭ সালে ৭০০ গ্রাম ওজনের দু’টি আম আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হয়েছিল ৩,৭০০ ইউএস ডলারে। এ পর্যন্ত আমের এটাই সর্বোচ্চ দাম।’ তবে রাজস্থানের কৃষক কিষাণ সুমনের প্রচেষ্টায় মিয়াজাকি ভারতে প্রথম ফলানো হয়।
ভারতও কম যায় না, বরং পরিমাণ ও বৈচিত্রের দিক থেকে ভারতে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু আম আছে। একনম্বর না হলেও বিশ্বে দু’নম্বরে আছে আলফোনসো— উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ, তাতে লাল রঙের আভা। অপূর্ব এর স্বাদ, গন্ধ, টেক্সচার, রসে টইটম্বুর, আঁশবিহীন। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়। ওজন ১৫০-৩০০ গ্রাম। এটা প্রধানত পশ্চিম ভারতের কোঙ্কন অঞ্চলে জন্মায়। বিশ্বজোড়া এর বাজার।
পর্তুগিজ জেনারেল আলফোনসো ডি আলবুকার্ক ১৫ শতকে এশিয়ায় পর্তুগিজ উপনিবেশ স্থাপনের জন্য পরিচিত। আলবুকার্ককে গোয়ার বিজয়ী উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তাঁর শাসনকালে ভারত বিদেশ থেকে আনা প্রথম শুকনো লঙ্কা, ভুট্টা, টমেটো এবং আলুর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। আলফনসো এই অনুশীলনের অংশ হিসাবে আমের এক নতুন প্রজাতির বীজ বপন করেছিলেন। তারপর তা ইউরোপে রফতানি করা হয়েছিল। ভারতের স্থানীয় ভেরিয়েন্টগুলি ছিল নরম এবং মসৃণ। শাঁস চুষে বের করা যেত, তাই এগুলিকে ‘চোষা আম’ বলা হয়। আলবুকার্ক চেয়েছিলেন মিষ্টি এবং পুরুষ্টু আম ইউরোপে রফতানি করতে। তাই বিকল্প আম তৈরি করার জন্য এই আমগাছের কলম শুরু করেন। তাঁদের শ্রমের ফল আজকের আলফোনসো আম।
বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত চৌষা প্রধানত দক্ষিণ এশিয়া, ভারত ও পাকিস্তানে ফলে। স্বাদে অবিশ্বাস্য রকমে মিষ্টি। এ আমের রস সরাসরি চুষে খাওয়া যায়, তাই নাম চৌষা।
ফিলিপাইনসে উৎপন্ন শীর্ষ জাতের আম কারাবাও ফিলিপাইন আম বা ম্যানিলা আম নামেও পরিচিত। পাকা আমের রং সবুজের উপর গাঢ় হলুদ। এতে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, অ্যামিনো অ্যাসিড এবং ম্যাগনেসিয়াম আছে। কারাবাও আমের ১৪টি ভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুসারে, কারাবাও সব আমের মধ্যে সবচেয়ে মিষ্টি।
মায়ানমারের সেইন তা লোন আম ডায়মন্ড সলিটায়ার আম নামেও পরিচিত। মায়ানমারের মানুষের কাছে আম খুব জনপ্রিয় ফল। স্বাদ, রং ও আকৃতিতে খুব ভালো জাতের আম। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া যায়। ছাল পাতলা কমলা-হলুদ রঙের এবং অত্যন্ত সুগন্ধী।
মেক্সিকোর আতাউলফোরের টেক্সচার খুব রেশমি নরম। মেক্সিকো বরাবরই বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম আম রফতানিকারক দেশ। স্বাদে মিষ্টি ও টকের সংমিশ্রণ। সরু, খুব পাতলা মুখ। এতে ভিটামিন এ এবং সি থাকে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর এর আয়ু। আতাউলফো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় জনপ্রিয় বিক্রিত আম।
আমেরিকার টমি অ্যাটকিন্স আমে আঁশ আছে, তবে মিষ্টি এবং রসালো শাঁসের জন্য পরিচিত। রফতানিযোগ্য এ আম গাঢ় রঙের। অনেকদিন থাকে এবং বহুদিন ধরে ফলন হয়। এ গাছ অনেকদিন বাঁচে, তাই অনায়াসে দূরে নিয়ে যাওয়া যায়।
জ্যামাইকার সবচেয়ে জনপ্রিয় জাতের আম জুলি সেন্ট জুলিয়ান নামেও পরিচিত। শাঁসালো, মিষ্টি নারকেলের মতো গন্ধ। আকারে ছোট সবুজ ও কিছুটা লালচে। যাদের ছোট বাগান, তাদের জন্য ভালো, কারণ গাছের উচ্চতা কম, আর খুব কম জায়গা নেয়। আমের এ জাতটি ভারতীয় আমের বংশধর। ফ্লোরিডায় জুন থেকে জুলাই মাসে এ ফল পাকে।
ন্যাম ডক মাই থাইল্যান্ডের বিখ্যাত আমের একটি। এটি বাণিজ্যিকভাবে অস্ট্রেলিয়া এবং কলম্বিয়ায় ফলানো হয়। লম্বাটে, ছুঁচালো। রং হলুদ ও সবুজ দাগওয়ালা, মনোরম গন্ধ আর খুব মিষ্টি স্বাদ। গাছটি বেশি বড় নয়, প্রায় ৬ মিটার।
হনি গোল্ড আম তীব্র মিষ্টি স্বাদের জন্য পরিচিত। হলুদ-কমলা ছাল আর আঁশবিহীন শাঁস। অন্যান্য জাতের তুলনায় ছোট একটি আঁটি থাকে। এ আম ১৯৯১ সালে কুইন্সল্যান্ডের রকহ্যাম্পটন অঞ্চলে আচমকা ফলানো হয়েছিল। অন্যান্য জাতের আমের তুলনায় এতে বেশি শাঁস থাকে।
কোহিতুর
বাংলার মুর্শিদাবাদের কোহিতুরের নামকরণ করা হয়েছে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ হিরে কোহিনূরের নামে। রাজকীয় এই আম মুর্শিদাবাদের নবাবের জন্য ফলানো হয়েছিল। অধুনা বিলুপ্ত কালোপাহাড় এবং অন্য একটি অনামী প্রজাতির মিশ্রণ এই আম ১৮ শতকে নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্য তাঁর উদ্যানতত্ত্ববিদ তৈরি করেছিলেন, যাঁর কাজ ছিল নবাবদের জন্য বহিরাগত বৈচিত্রপূর্ণ ফল তৈরি করা।
সুস্বাদু এই আমের সীমিত উৎপাদন এর দাম বাড়িয়ে দেয় এবং এর পৃষ্ঠপোষকরা অধীর আগ্রহে নতুন ফসলের জন্য অপেক্ষা করেন। প্রতিটির দাম ১,০০০ টাকার বেশি। আমাদের হিমসাগর বেঁচে থাক। বাংলার মালদার ল্যাংড়া অত্যন্ত মিষ্টি সুস্বাদু আম।
মুভান্দন
কেরালার এই আমের নামে ‘মুন্নু’ মানে তিনটি এবং ‘আন্দ’ মানে বছর। এই আম গাছ রোপণের তিন বছরের মধ্যে ফল দেওয়া শুরু করে। মূলত ইদুক্কি জেলার এই আম তার নিজস্ব স্বাদ অম্লমধুর, পুরু শাঁসের জন্য বিখ্যাত। এই আমটি খাওয়ার একটি প্রচলিত জনপ্রিয় উপায় হল, নুন-মশলা দিয়ে পাকানো হয়।
নূরজাহান
মধ্যপ্রদেশের এই আমের উৎপত্তি আফগানিস্তানে বলে মনে করা হয় এবং বর্তমানে কাথিওয়াড়ার স্থানীয় কৃষকরা বিশ্বাস করেন যে, তাঁরাই এই ফলের একমাত্র চাষি। এর খ্যাতির অন্যতম কারণ হল, এটি বিশ্বের বৃহত্তম আমের মধ্যে একটি। এক একটি আমের ওজন আড়াই থেকে সাড়ে তিন কেজি পর্যন্ত। অথচ গাছটি ছোট, ঝাঁকালো। নিজের ফলের ওজন নিতে পারে না। এই আম আবার মাল্লিকা-ই-আম নামেও খ্যাত।
তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর ইমাম পসন্দ অতীতের রাজকীয় আর একটি আম। স্বাদ, মিষ্টির সঙ্গে সাইট্রাস ফুলের আফটার টেস্ট। এটি মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের প্রিয় ফল বলে বিশ্বাস করা হয়। এই আমকে হুমায়ুন পসন্দও বলা হত। স্থানীয় জাতের আম। সীমিত পরিমাণে জন্মায়।
দশেরি, বাদামি, চৌসা, হিমসাগর, এমনকী আরও বিভিন্ন স্থানীয় জাতের যে আমই হোক না কেন, সবগুলিই ভারত জুড়ে প্রিয় এবং সুস্বাদু। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সবচেয়ে বিখ্যাত আম কোনটা, তবে অবশ্যই আলফোনসো তর্কাতীতভাবে সবার আগে থাকবে।
