ভাস্কর সেনগুপ্ত

সম্প্রতি ম্যানেজমেন্টের ওপর দুটো বক্তৃতা শোনার সুযোগ হল। শুনতে শুনতে মনে হল, আমাদের সনাতন ধর্ম (হিন্দু ধর্ম) তো একই শিক্ষার কথা বলে।
প্রথম বক্তৃতার ভাবার্থ: কখনও দেখেছেন, আমিতাভ বচ্চন মার্সিডিস-বেঞ্জ গাড়ি কিনে পিছনে একটি জুতো ঝুলিয়ে রেখেছেন? কখনও দেখেছেন, মুকেশ আম্বানি একটি প্লেন কিনে সামনে লেবু-লঙ্কা ঝুলিয়ে রেখেছেন? কখনও দেখেছেন, আদানি রোল রয়েস কিনে পিছনে লিখে রেখেছেন, বুরি নজরবালে তেরা মুহ কালা? কখনও দেখেছেন, শাহরুখ খান তাঁর লেটেস্ট গাড়িটির পিছনে লিখে রেখেছেন, ‘দেখবি, জ্বলবি আর লুচির মতো ফুলবি’? এসব দৃশ্য আমরা দেখতে পাই না। এসব লেখা দেখা যায় অটো বা টোটোর পিছনে অথবা ভাঙা ঝড়ঝড়ে জনসন গাড়ির পিছনে কিংবা বিকট আওয়াজ করতে করতে যাওয়া ম্যাটাডোরের পিছনে।
জীবনে বড় স্বপ্ন দেখতে শিখতে হয়। স্বপ্ন যত ছোট হবে, জীবন তত ছোট হবে। যত বড় হবে স্বপ্ন, তত বড় হবে জীবন।
আমাদের শাস্ত্রে পাই, ভূমৈব সুখম নাল্পে সুখমস্তি। ভূমা অর্থ বৃহৎ। অর্থাৎ বৃহতে সুখ আছে, অল্পে নেই। শাস্ত্রের অন্যত্র পাই, আত্মানাম বিদ্ধি। নিজেকে বড় করো। নিজেকে নিজের নগরী, শহর, দেশ, মহাদেশ, পৃথিবী, মহাবিশ্বের মধ্যে বিস্তৃত করো। নিজেকে যত বড় করবে, তত সুখ। কূপমণ্ডুক অর্থাৎ কুয়োর ব্যাঙ হওয়ায় কোনও সুখ নেই।
শাস্ত্রের শিক্ষা আর ম্যানেজমেন্ট শিক্ষার মধ্যে সাদৃশ্য প্রমাণ করে, আমাদের মুনি-ঋষিরা বনজঙ্গলে, পর্বতকন্দরে বসে জপতপ স্বাধ্যায়ের মাধ্যমে যে জ্ঞান আহরণ করেছিলেন, অতি আধুনিককালে ম্যানেজমেন্ট শিক্ষকরা বহু ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা কর্ষণ করে সেই একই তত্ত্বে উপনীত হচ্ছেন। ভাবলে খুবই আশ্চর্য হতে হয়, অত্যাধুনিক ডেটা বিজ্ঞানের মাধ্যমে যে জ্ঞান আহৃত হচ্ছে, মুনি-ঋষিরা সে জ্ঞান শুধু মনন, দর্শন আর যোগের মাধ্যমে আহরণ করেছিলেন।
দ্বিতীয় বক্তৃতার ভাবার্থ: সিংহকে বনের রাজা কেন বলে? সিংহের চেয়ে হাতি বলবান। সিংহের চেয়ে চিতা দ্রুতগামী। সিংহের চেয়ে শেয়াল ধূর্ত। তবু সিংহ কেন বনের রাজা? একটি হাতি ও সিংহ মুখোমুখি হলে সিংহের বিশ্বাস আছে যে, সে হাতিকে পরাজিত করতে পারবে। হাতির সে বিশ্বাস নেই। তাই হাতি পিছপা হয়। এখানেই সিংহের সঙ্গে অন্য সকল প্রাণীর পার্থক্য। তাই ম্যানেজমেন্ট শিক্ষার প্রথমে বিশ্বাস করো, তুমি সবার উপরে থাকবে। আম্বানি, আদানি, অমিতাভ বচ্চন এই বিশ্বাস করতেন, তাই তাঁরা শীর্ষে। বিশ্বাস করলে ফলপ্রাপ্তি অবশ্যম্ভাবী।
আমাদের শাস্ত্র ঠিক এ কথাই বলেছে। আমাদের গ্রামগঞ্জের মানুষও এ শিক্ষা পেয়েছেন বিভিন্ন কথকতা, নাটক, গল্প, যাত্রা থেকে। এমনই বহুল প্রচলিত একটি গল্প ‘বিশ্বাসে বৈকুণ্ঠ মেলে, তর্কে বহুদূর’। কোনও একটি দেশে এক ধূর্ত কথক ঠাকুর বাস করতেন। বিভিন্ন জায়গায় ভক্তদের মাঝে ঠাকুরের কথা আলোচনা করতেন। ভক্তরা খুশি হয়ে প্রণাম করে যা প্রণামী দিতেন, তা দিয়ে কথক ঠাকুরের সংসার চলে যেত। একবার এক সরল বিশ্বাসী মেছুনিকে দেখে সেই কথক ঠাকুরের মনে হল, এঁকে যদি দীক্ষা দিই, তাহলে এঁর কাছ থেকে প্রণামী হিসাবে মাছ পাওয়া যেতে পারে। খাওয়াটা ভালোই হবে।
একদিন কথক ঠাকুর সেই মেছুনিকে বললেন, দীক্ষা নিবি?
মেছুনি তো বিহ্বল হয়ে গেলেন। বললেন, ঠাকুর, আমার কি সে সৌভাগ্য হবে?
লোভী কথক ঠাকুর বললেন, যা, নদী থেকে স্নান করে আয়। আজই দীক্ষা দেব।
নিত্য মাছ পাওয়ার লোভে কথক ঠাকুর তখনই দীক্ষা দিলেন। মন্ত্র দিলেন, আয় ছাগলি, পাতা খা।
সরলমতি বিশ্বাসী ভক্ত মেছুনি বুঝতেই পারলেন না, তাঁর সঙ্গে প্রবঞ্চনা করা হল। মেছুনি রোজ যা মাছ পেতেন, তার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্টটি কথক ঠাকুরকে প্রণামী হিসাবে দিয়ে যেতেন।
বেশ কয়েকমাস কেটে গেল। কথক ঠাকুর ভেবেছিলেন, দু’দিনের মধ্যেই মেছুনি বুঝে যাবেন, আর মাছ দেবেন না। ভাবলেন, এখনও তিনি ধরতে পারেননি যে, তাঁকে বোকা বানানো হয়েছে। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, কেমন চলছে তোর?
মেছুনি সলজ্জভাবে জানালেন, কী বলব ঠাকুরমশাই, রোজ ভগবান ছাগল হয়ে এসে আমার কাছ থেকে পাতা খেয়ে যান। সবই আপনার কৃপা।
কথক ঠাকুর বললেন, আমাকে দেখাতে পারবি।
— হ্যাঁ ঠাকুর, নিশ্চয়ই দেখাব। সকালে গঙ্গার ধারে আসবেন।
পরদিন মেছুনি স্নান করে একটি কাঁঠাল গাছের ডাল নিয়ে অত্যন্ত ভক্তিভরে গুরু প্রদত্ত মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকলেন। এমন সময় সত্যি সত্যিই একটি ছাগল এসে পাতা খেতে থাকল। মেছুনি চেঁচিয়ে উঠলেন, দেখুন ঠাকুরমশাই, ভগবান ছাগল হয়ে এসে পাতা খাচ্ছেন।
অবিশ্বাসী, ভণ্ড, জোচ্চোর কথক ঠাকুর ছাগল দেখতে পেলেন না, কিন্তু পাতা কমে যাচ্ছে দেখতে পেলেন। কথক ঠাকুর বুঝলেন, তিনি ধাপ্পা দিয়েছেন, কিন্তু মেছুনির তাঁর সরল বিশ্বাসের জোরে ভগবতপ্রাপ্তি হল। কথক ঠাকুর আর স্থির থাকতে পারলেন না। অশিক্ষিত মেছুনির পায়ে পড়লেন। বললেন, তুই আমায় ক্ষমা কর। আমার বিশ্বাস নেই, তাই দর্শন পেলাম না।
বিশ্বাসের এই অমোঘ শক্তি আজকের ম্যানেজমেন্ট ক্লাসে পাঠ্য। কিন্ত আমাদের দেশের গ্রাম্য অশিক্ষিত বধূদেরও এ জ্ঞান আছে। এখানেই আমাদের সনাতন ধর্মের বিশেষত্ব।
আর একটি গল্প ‘হরিপ্রিয়া রামনামে হেঁটে গঙ্গা তরে’। নদীর ধারে বসে এক কথক ঠাকুর নিত্য ভগবত পাঠ করতেন। একদিন পাঠ করার সময় কথক ঠাকুর বললেন, বিশ্বাসে ভগবান মেলে। অন্য কোনও উপায়ে তাঁকে পাওয়া যায় না। তিনি বললেন, রামনাম দৃঢ় নৌকা সংসারার্ণব তারিণী।/ ফলং বিশ্বাসিনাং চৈব নান্যেষাং তু কদাচন।। অর্থাৎ রামনামের নৌকো সংসারসাগর পার করার তরণী। হরিপ্রিয়া নামে এক ধনী চণ্ডালকন্যা নিত্য সে পাঠ শুনতে আসতেন। তিনি থাকেন ঠিক নদীর উলটোদিকে। খেয়াঘাট অনেক দূর হওয়ায় রোজ আসতে দেরি হয়ে যায়। সেদিন পাঠ শোনার পর তাঁর মনে হল, রামনামে যদি সংসারসাগর পার হওয়া যায়, তবে এ নদী তো সামান্য! পাঠ শুনে বাড়ি ফেরার সময় সেদিন আর তিনি খেয়াঘাটে গেলেন না। রামনাম করতে করতে নদীতে নেমে পড়লেন। তিনি যত এগোন, জল তত বাড়তে থাকে। হাঁটু ছাড়িয়ে কোমর। কোমর ছাপিয়ে বুকে। বুক ছাপিয়ে গলা। তারপর নাকের কাছে জল উঠে এল। হরিপ্রিয়ার কোনও হুঁশ নেই। তিনি এগিয়ে চললেন। জল এবার কমতে থাকল। নাক থেকে গলা। গলা থেকে বুক। তারপর কোমর, হাঁটু। নদী পেরিয়ে গেলেন হরিপ্রিয়া। আর তিনি খেয়াঘাটে যান না। এমনই নিত্য চলতে থাকল।
হরিপ্রিয়ার বহুদিনের বাসনা, কথক ঠাকুরকে বাড়িতে নিয়ে যাবেন। ভালো প্রণামী পাওয়ার লোভে কথক ঠাকুর একদিন রাজি হলেন। তিনি ভাবলেন, নৌকো করে পার হবেন। কিন্তু হরিপ্রিয়া সরাসরি নদীর দিকে এগোতে থাকলেন। কথক ঠাকুর বললেন, হরিপ্রিয়া, খেয়া ঘাটে যাবে না? হরিপ্রিয়া বললেন, আসুন না ঠাকুরমশাই। রামনাম করতে করতে পেরিয়ে যাব। আপনিই তো বলেছেন, রামনাম দৃঢ় নৌকা সংসারার্ণব তারিণী।
ঠাকুরমশাই মুখে কিছু বললেন না। মনে মনে ভাবলেন, ওসব বইয়ে লেখা থাকে, বাস্তবে হয় নাকি!
অনিচ্ছা সত্ত্বেও কথক ঠাকুর হরিপ্রিয়ার পিছনে পিছনে চললেন। হরিপ্রিয়া রামনাম করতে করতে নদী পেরিয়ে গেলেন। ঠাকুরমশাই কিছুটা গিয়ে ফিরে এলেন। বললেন, ফলং বিশ্বাসিনাং চৈব নান্যেষাং তু কদাচন। অর্থাৎ তোর বিশ্বাস আছে, তাই পেরিয়ে গেলি। আমার সে বিশ্বাস নেই।
আমাদের সনাতন ধর্মের গর্ভে এমন বহু অমূল্য সম্পদ নিহিত রয়েছে। সারাবিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে কতই না চর্চা হচ্ছে। আর আমরা হিন্দুপ্রধান ভারতে বাস করেও শাস্ত্রশিক্ষা চালু করতে পারি না।
