কাজল মুখার্জি

পৌষ মাসের শেষ দিনে পালিত সংক্রান্তি ভারতের নানা প্রান্তে বিভিন্ন নামে পরিচিত এবং প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। এটি শুধু ফসল কাটার উৎসব নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতীক। পশ্চিমবঙ্গে এই দিনটি পৌষ সংক্রান্তি নামে পরিচিত। বাড়ি বাড়ি তৈরি হয় পিঠেপুলি, পাটিসাপটা, নলেন গুড়ের পায়েস।
বিহার ও উত্তরপ্রদেশে এই দিন মকর সংক্রান্তি নামে পরিচিত। বিশেষ খাবার হিসাবে তিল-গুড়ের লাড্ডু ও খিচুড়ি খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। মানুষ এই দিনে গঙ্গায় স্নান করে ধর্মীয় আচার পালন করে, তাদের মতে, তা পাপ থেকে মুক্তি দেয়।
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে এই সংক্রান্তি পোঙ্গল নামে উদযাপিত হয়। এটি চারদিনের একটি উৎসব। প্রধান আকর্ষণ পোঙ্গল পায়াসম (একধরনের মিষ্টি ভাত)। কৃষকরা এই উৎসবের মাধ্যমে সূর্যদেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অসমে এই উৎসবটি মাঘ বিহু নামে পরিচিত। এটি নতুন ধানের ফসল কাটার পর উদযাপিত হয়। আগের রাতে খোলা জায়গায় মাচা বানিয়ে ভোগালি বিহু পালিত হয়, যেখানে পিঠা ও মাছ-মাংসের ভোজ হয়।
মহারাষ্ট্রে এই দিনটিতে একে অপরকে তিল-গুড় লাড্ডু দিয়ে বলে, “তিল গুড ঘ্যা, গুড গুড বল” (তিল ও গুড় নাও, মিষ্টি কথা বলো)। গুজরাটে এই সময় ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব হয়। আকাশ ভরে যায় রঙিন ঘুড়িতে।
পঞ্জাবে মকর সংক্রান্তি উদযাপিত হয় লোহরি বা লোরি নামে। আগুন জ্বালিয়ে তার চারপাশে নাচ-গানের আয়োজন করা হয় আর বিশেষ খাবার হিসাবে থাকে মক্কির রুটি ও সরষে শাক।
সংক্রান্তি শব্দের অর্থ সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ। মকর সংক্রান্তি সেই মুহূর্তের নাম, যখন সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশ করে। এটি শীতের অবসান এবং বসন্তের আগমনের সূচক। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্রের কারণে সংক্রান্তির এই ভিন্নরূপ দেখা যায়।
অ্যারিয়ান সংক্রান্তি: প্রাচীনকালে এই উৎসবটি পারস্য এবং মধ্য এশিয়ায় সূর্যের আরাধনার উৎসব হিসাবে উদযাপিত হত।
ধর্মীয় তাৎপর্য: পুরাণ অনুসারে, ভগীরথ মকর সংক্রান্তির দিনেই গঙ্গাকে মর্তে নিয়ে আসেন। এ কারণে ধর্মীয় রীতি অনুসারে গঙ্গাসাগর বা গঙ্গা বা অন্য কোনৌ নদী বা জলাশয়ে স্নান করা হয়। গঙ্গাসাগর মেলা হল ভারতের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ, যা মকরসংক্রান্তির দিন অনুষ্ঠিত হয়।
পৌষ সংক্রান্তির ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় দিক
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, মকর সংক্রান্তির দিনই ভগীরথ গঙ্গাকে মর্তে আনেন। এই দিনে সূর্যদেব মকর রাশিতে প্রবেশ করেন, যা কৃষকদের জন্য ফসল কাটার সময়ের সূচনা। বলা হয়, এই দিনটি দেবতাদের জাগরণের দিন। পৌষ সংক্রান্তির শিকড় প্রাচীন ভারতীয় কৃষি সভ্যতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এটি মূলত প্রকৃতির পরিবর্তন উদযাপনের উৎসব। শীতকাল শেষে বসন্তের আগমন উদযাপিত হয়। পারস্য এবং ব্রাজিলেও সূর্য আরাধনার উৎসব পালিত হয়, যার সঙ্গে ভারতের সংক্রান্তি উৎসবের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
গুজরাটে উত্তরায়ণে ঘুড়ি ওড়ানোর রীতি ২০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। মকর সংক্রান্তি শুধু একটি উৎসব নয়, এটি ভারতের কৃষি, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রকৃতি, ফসল এবং মানুষের পরিশ্রমকে সম্মান জানিয়ে এই উৎসব আজও মানুষের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন গড়ে তোলে। এটি আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং আনন্দ, ঐক্য ও কৃতজ্ঞতার বার্তা বহন করে।
এবারের মকর সংক্রান্তির বিশেষত্ব হল, এর সঙ্গে প্রয়াগরাজের মহাকুম্ভমেলার যোগ। মহাকুম্ভ ভারতীয় ধর্মীয় জীবনের একটি অন্যতম বৃহৎ উৎসব। এই সংযোগ মকর সংক্রান্তিকে এ বছর একটি নতুন মাত্রা দান করেছে।
পুরাণ মতে, সমুদ্রমন্থনের সময় দেবতা ও অসুরদের মধ্যে অমৃত (অমরত্বের পানীয়) নিয়ে যে দ্বন্দ্ব হয়েছিল, তার চারটি বিন্দু পড়েছিল চার স্থানে, প্রয়াগরাজ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী এবং নাসিকে। এই চার জায়গায় অনুষ্ঠিত হয় কুম্ভমেলা। প্রয়াগরাজের মহাকুম্ভকে অত্যন্ত পবিত্র হিসাবে গণ্য করা হয়। সেখানে গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতীর সঙ্গমস্থলে স্নান করা পাপমোচন ও মোক্ষলাভের প্রতীক বলে মনে করা হয়। মহাকুম্ভমেলা মকর সংক্রান্তির সঙ্গে জড়িত। এই সময় সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশ নতুন বছরের সূচনা এবং এই যুগলবন্দি ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
