কাজল মুখার্জি

মহাশিবরাত্রি হিন্দু ধর্মের অন্যতম পবিত্র উৎসব। এটি শিবের আরাধনায় নিবেদিত। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়।
এ বছর মহাশিবরাত্রি পালিত হচ্ছে ২৬ ফেব্রুয়ারি, বুধবার। চতুর্দশী তিথি শুরু হবে ২৬ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টা ৮ মিনিটে এবং শেষ হবে ২৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা ৫৪ মিনিটে।
পুরাণ মতে, মহাশিবরাত্রি তিথিতে ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। এছাড়াও এই রাতে শিব সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মহাতাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন। তাই এই দিনটি শিব ও শক্তির মিলনের প্রতীক হিসাবে উদযাপিত হয়।
সমুদ্র মন্থনের সময় উৎপন্ন হলাহল বিষ থেকে সৃষ্টিকে রক্ষা করতে ভগবান শিব তা পান করেন। এর ফলে তাঁর শরীর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁর তাপ প্রশমিত করতে ভক্তরা শিবলিঙ্গে কাঁচা দুধ ও জল ঢালেন, যা তাপ কমাতে সহায়তা করে।
মহাশিবরাত্রির দিনে ভক্তরা ভগবান শিবের বিভিন্ন মন্ত্র জপ করে থাকেন। তার মধ্যে অন্যতম হল ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ মন্ত্রটি, যা শিবের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তির প্রকাশ।
মহাশিবরাত্রি তিথি ভক্তদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনে উপবাস, রাত্রি জাগরণ ও শিবের পূজা-অর্চনা করলে ভগবান শিবের আশীর্বাদ লাভ হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই ব্রত পালন করলে পাপমোচন হয় এবং জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি আসে।
মহাশিবরাত্রি ব্রত পালন ভক্তদের আধ্যাত্মিক উন্নতি, পাপ থেকে মুক্তি এবং শিবের কৃপা লাভে সহায়তা করে। এছাড়া এই ব্রত দাম্পত্য জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি আনে বলে মনে করা হয়।
মহাশিবরাত্রি উপলক্ষে ভক্তরা শিবমন্দিরে গিয়ে বা বাড়িতে পূজা-অর্চনা, উপবাস পালন এবং সারারাত জেগে শিবের নাম সংকীর্তন করেন। এই পবিত্র তিথি ভক্তদের জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি নিয়ে আসে।
মহাশিবরাত্রিতে ভক্তরা শিবের আরাধনা নির্দিষ্ট কিছু উপাচার ও বিধি মেনে করে থাকেন। মূলত এই দিনে চার প্রহরের শিবপূজা করা হয়। প্রতিটি প্রহরে শিবলিঙ্গে বিশেষ উপকরণ নিবেদন করা হয়।
শিব আরাধনার প্রধান উপাচার: গঙ্গাজল বা বিশুদ্ধ জল শিবলিঙ্গ অভিষেকের জন্য। কাঁচা দুধ ও দই শিবের তাপ প্রশমিত করতে। ঘি পবিত্রতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক। মধু মিষ্টতা ও প্রশান্তি দানের জন্য। বেলপাতা শিবের অত্যন্ত প্রিয় জিনিস। ধুতরা ফুল ও ফল শিবের পছন্দের, যা তাঁকে প্রসন্ন করে। আকাশ ফুল (অকন্দ)শিবপুজোয় ব্যবহৃত হয়। ভাঙের পাতা শিবের আরাধনায় ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। চন্দন শীতলতা প্রদান করে এবং পুজোর মাহাত্ম্য বাড়ায়। ধূপ ও প্রদীপ পরিবেশ শুদ্ধ ও পুজোকে পবিত্র করতে। পঞ্চামৃত (দুধ, দই, মধু, ঘি ও গঙ্গাজল মিশ্রণ)শিবলিঙ্গ অভিষেকের জন্য। ফল, প্রসাদ ও নৈবেদ্য ভক্তরা শিবের উদ্দেশে নিবেদন করেন। মহাশিবরাত্রিতে শিবপুজোয় ব্যবহৃত ফুল: শাস্ত্র মতে, ভগবান শিব নির্দিষ্ট কিছু ফুল পছন্দ করেন, যা শিবপুজোয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। বেলফুল শিবের অত্যন্ত প্রিয়, যা পূর্ণ ভক্তি সহকারে নিবেদন করা হয়। ধুতরা ফুল শিবপুজোর অন্যতম প্রধান উপকরণ, যা মহাদেবকে প্রসন্ন করে। আকন্দ (আকাশ ফুল) শিবের পুজোয় অত্যন্ত শুভ। কনকচাঁপা শুভফলদায়ক বলে শিবপুজোয় ব্যবহৃত হয়। সকালে সংগ্রহ করা শিউলি ফুল শিবকে অর্পণ করা হয়। জুঁই ফুল ছোট হলেও শিবপুজোয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নাগেশ্বর ফুল শিবলিঙ্গের উপর নিবেদন অত্যন্ত শুভ। হরশৃঙ্গার ফুল মহাদেবের আশীর্বাদ লাভের জন্য নিবেদন করা হয়।
ফল: শিবরাত্রিতে শিবকে নির্দিষ্ট কিছু ফল নিবেদন করলে বিশেষ আশীর্বাদ লাভ হয় বলে মনে করা হয়। বেল শিবের অন্যতম প্রিয় ফল, যা পুজোয় অবশ্যই নিবেদন করা হয়। নারকেল পূর্ণতা ও শুদ্ধতার প্রতীক, যা শিবলিঙ্গের সামনে ভেঙে নিবেদন করা হয়। আঙুর মিষ্টতা ও সৌভাগ্যের প্রতীক। আনার (ডালিম) শারীরিক ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতীক। আপেল শিবপুজোয় পবিত্র ফল হিসাবে নিবেদন করা হয়। কলার থোড় কিছু অঞ্চলে শিবপুজোয় নিবেদন করা হয়। কমলালেবু শুভ ফলদায়ক এবং পুজোয় ব্যবহৃত হয়। পুরাণ মতে, শিবপুজোয় খেজুর নিবেদন করলে সিদ্ধিলাভ হয়। শিবপুজোয় এসব ফুল ও ফল নিবেদন করলে ভক্তদের সকল মনস্কামনা পূর্ণ হয় বলে মনে করা হয়।
উপবাসের নিয়ম:
মহাশিবরাত্রির উপবাস দু’ভাবে পালন করা হয়। সম্পূর্ণ উপবাস (নির্জলা): অনেকে এই দিন একফোঁটা জলও গ্রহণ করেন না এবং নির্জলা উপবাসে থাকেন। যাঁরা কঠোর ব্রত পালন করেন, তাঁরা শুধু শিবপুজো ও ধ্যান-সাধনায় মনোনিবেশ করেন। ফলাহার বা অর্ধ-উপবাস: কিছু ভক্ত শুধু ফল, দুধ, চিনি ও শুকনো ফল গ্রহণ করেন। নিরামিষ খাবার খাওয়া যেতে পারে, তবে নতুন চাল বা গম জাতীয় খাবার বর্জন করা হয়। কঠোর উপবাস পালন করতে চাইলে নির্জলা উপবাস করা যায়।
যাঁরা নির্জলা উপবাসে থাকতে পারেন না, তাঁরা ফলাহার বা দুধ খেয়ে ব্রত পালন করতে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, বয়সজনিত সমস্যা বা দুর্বল শরীর থাকলে নির্জলা উপবাস না করাই ভালো।
পুজোর বিশেষ মুহূর্ত ও শুভ সময়: মহাশিবরাত্রিতে চার প্রহরের শিবপুজো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাতে শিবনামে জাগরণ করার বিশেষ মাহাত্ম্য আছে। মহাশিবরাত্রিতে উপবাস ও পুজো করলে শিবের কৃপালাভ হয় এবং জীবনের সকল বাধা দূর হয়। তাই নিজের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রত পালন করাই শ্রেয়।
