কাজল মুখার্জি

১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট মধ্যপ্রদেশের খান্ডওয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অলৌকিক প্রতিভার অধিকারী আভাসকুমার গাঙ্গুলি (ডাকনাম অভি), যিনি পরবর্তীকালে ভারতীয় সংগীতজগতে অসামান্য অবদানের জন্য সবার হৃদয়ে জায়গা করে নেন কিশোর কুমার নামে। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন এক একটি গল্প, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে হাসি-কান্না, বোহেমিয়ানতা, গাম্ভীর্য, উন্মাদনা ও অতুলনীয় শিল্পসত্তা।
কিশোর কুমার ছিলেন একাধারে গায়ক, অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, সুরকার, কবি ও চিত্রশিল্পী। বলিউডের ইতিহাসে এমন বহুমুখী প্রতিভা বিরল। নিজের সিনেমায় গানে নিজেই কণ্ঠ দিতেন, পরিচালনা করতেন, অভিনয় করতেন, এমনকী চিত্রনাট্য, সংলাপও লিখতেন। ‘পড়োসন’ (১৯৬৮) ছবিতে ‘মেরে সায়ঁয়্যো কা নাম হ্যায়’ গানটিতে তাঁর কমেডি পারফরম্যান্স এখনও অনন্য। এই সিনেমায় মেহমুদ ও সুনীল দত্তর পাশে কিশোর নিজের অভিনয় ও কণ্ঠ দিয়ে নিয়ে নেন সব আলো। তিনি নাকি বাড়িতে রেকর্ডিং মাইক্রোফোনে চিৎকার করে রেওয়াজ করতেন এবং বলতেন, ‘আমি নিয়ম করে অনিয়ম করি, তবেই সুরে জাদু থাকে।’
কিশোর কুমারের ব্যক্তিত্ব ছিল চরম খেয়ালি। অনেকেই তাঁকে ‘পাগল’ ভাবতেন। শুটিংয়ের সেটে কখনও মুখে সাদা কাপড় বেঁধে চুপ করে বসে থাকতেন, কখনও দরজায় লিখে রাখতেন, ‘BEWARE OF KISHORE’। তবে এই খেয়ালিপনার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অত্যন্ত পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী শিল্পী, যিনি নিখুঁত টেকের জন্য দিনের পর দিন একই গান রিহার্স করতেন। শুধু গাওয়া নয়, তিনি চরিত্রের কণ্ঠ তৈরি করতেন গানে। রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, জিতেন্দ্র, দেব আনন্দ, প্রত্যেকের জন্য তিনি আলাদা আলাদা কণ্ঠস্বর ও ভঙ্গি তৈরি করতেন। ‘জিন্দেগি কা সফর’, ‘কোরা কাগজ’, ‘চিঙ্গারি কই ভড়কে’, ‘পল পল দিল কে পাস’, প্রতিটি গান যেন সংলাপ।
কিশোর কুমার বাংলা গানেও এক অনন্য সম্পদ। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’, ‘আকাশ কেন ডাকে’ প্রভৃতি আজও প্রেম-বিরহের অমর সংগীত। তাঁর ছিল অবিভক্ত বাংলা ও ভারতের সেতুবন্ধনকারী কণ্ঠস্বর। তাঁর কণ্ঠে শোনা যেত দুই বাংলার সুর ও মাটির গন্ধ। ‘দূর গগন কি ছাঁও মে’, ‘দো অঁখে বারাহ হাথ’, এসব ছবিতে কিশোর কুমার প্রমাণ করেন, তিনি একজন সফল দৃষ্টিভঙ্গির পরিচালক। তিনি নিজেই বলতেন, ‘ভালো ছবি বানাতে টাকা নয়, ভালো মন লাগে।’
কিশোর কুমার বিয়ে করেন রুমা গুহঠাকুরতা, মধুবালা, যোগিতা বালি ও লীনা চন্দ্রভারকরকে। আর মধুবালার সঙ্গে তাঁর প্রেমকাহিনি তো কিংবদন্তি। কিশোরের সে প্রেমে সফল না হলেও সংগীতে ছিল তাঁর অবিরাম প্রেম ও সাধনা। ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে চলে গিয়েছেন তিনি। শেষ গান ছিল ‘গুরু’ সিনেমার ‘গুরু গুরু গুরু’। তাঁর মৃত্যুর আগে শেষ দিনেও তিনি হাসছিলেন, গান গাইছিলেন আর বলেছিলেন, ‘আমাকে খুঁজলে খুঁজো গানে’। ছোটবেলায় তাঁর গলায় কাঁটা ঢুকে গিয়েছিল। অনেকদিন ভালো করে কথা বলতে পারেননি।
কিশোরকে একবার বোম্বে স্টুডিয়ো থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া হয়, কারণ তিনি সরাসরি প্রযোজককে বলেছিলেন, ‘পেমেন্ট আগে, পারফরম্যান্স পরে।’ তিনি কোনও রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি, তবে জরুরি অবস্থার সময় গান গাওয়া বন্ধ রেখেছিলেন। বলতেন, ‘আমার মতো সংগীতশিল্পী হাজার হবে, কিন্তু কিশোর কুমার একটাই থাকবে।’ কিশোর কুমার এক স্রষ্টা, একটি কণ্ঠ, একটি যুগ, একটি অনুভব। যাঁর কণ্ঠে ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’ যেমন জীবনকে আনন্দ দেয়, তেমনই ‘কভি হ্যাঁ কভি না’ আমাদের মনে আনে হাহাকার।

A compact short glimpse of a genius….full of interesting informations about Kishore Kumar. The article would have been more compact if actor Kishore Kumar would have been discussed.