কাজল মুখার্জি

১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি কাশীপুর উদ্যানবাটিতে ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজেকে কল্পতরু রূপে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর জীবনের এই স্মরণীয় মুহূর্তে তিনি সকল ভক্ত ও উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোদের চৈতন্য হোক।’ সেই শব্দগুচ্ছ যেন মহাজাগরণের আহ্বান, আত্মবোধ ও আলোর পথে চলার মন্ত্র।
ঠাকুরের সেই চৈতন্যের আহ্বান কেবল তাঁর ভক্ত বা অনুসারীদের জন্য নয়, তা ছিল মানবসমাজের প্রতি এক অনন্য বাণী। চৈতন্য মানে শুধু আধ্যাত্মিক উন্মেষ নয়, এটি আত্মজ্ঞান, সঠিক পথচলা এবং মানবতার গভীর উপলব্ধি।
কিন্তু ২০২৫ সালের এই দিনে দাঁড়িয়ে আমরা কি সত্যিই তাঁর সেই চৈতন্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছি? সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায় বিভেদ, হিংসা, স্বার্থপরতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এক গভীর অন্ধকার। ঠাকুরের বার্তা ছিল মানবমুক্তি, সহানুভূতি, প্রেম এবং ঐক্যের। কিন্তু আমরা সে পথে কতটা এগিয়েছি?
আজকের দিনে প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু আমরা কি আমাদের মনুষ্যত্বকেও উন্নত করতে পেরেছি? ঠাকুর বলেছিলেন, ‘মানুষকে প্রথমে মানুষ হিসাবে জানতে শেখো, তাহলেই ঈশ্বরকে জানা সহজ হবে।’ অথচ বর্তমান সমাজে আমরা মানুষকে বিভক্ত করেছি জাতি, ধর্ম, শ্রেণি ও রাজনীতির নামে।
ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের কল্পতরু রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত চৈতন্যের মূল হল নিজের আত্মাকে চিনতে শেখা। তাঁর চৈতন্যের মন্ত্র আত্মানুসন্ধান। ঠাকুরের বার্তা ছিল, ‘যে যাঁর পথে থাকুন, কিন্তু সেই পথ যেন সত্য ও ন্যায়ের পথ হয়।’
এই দিনে আমরা যদি ঠাকুরের কথা অনুসরণ করে আত্মবিশ্লেষণ করি, তবে বোঝা যায় যে, তাঁর বার্তা এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক। আমাদের প্রয়োজন চৈতন্যের জাগরণ, নিজের প্রতি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। জীবে প্রেম, ঠাকুর বারবার প্রেমকে জীবনের মূলমন্ত্র হিসাবে দেখিয়েছেন। চাই সহনশীলতা ও ঐক্য। বিভেদকে পিছনে ফেলে মানবিকতার পথে এগিয়ে চলতে হবে। ঠাকুর শিখিয়েছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’
কল্পতরু দিবস শুধু আধ্যাত্মিক উৎসব নয়, কল্পতরু হল মানবতার প্রতি এক গভীর আহ্বান। ঠাকুরের চৈতন্যের বার্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের জাগরণ আসে আত্মার গভীর উপলব্ধি থেকে। আসুন, আমরা শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তাঁর কল্পতরু রূপকে জীবন এবং সমাজে এক নতুন চেতনা হিসাবে গ্রহণ করি। ‘তোদের চৈতন্য হোক’, এই বাক্য আমাদের প্রেরণা দিক, আমাদের আলোর পথে নিয়ে যাক।
