রাজকুমার মোদক ও রাহুল মুখার্জি
বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক থিয়োরি ‘বিগ ব্যাং’ হলেও কেন বিস্ফোরণ ঘটে ছিল, বিস্ফোরণের আগে আদৌ বিশ্ব বলে কিছু ছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বৈজ্ঞানিকরা অপারগ। তবে ভারতীয়রা সমগ্র সৃষ্টির মূলে এক আধ্যাত্মিক শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার তো করেছেই, পাশাপাশি তারা ওই শক্তিকে নানা দেবী রূপে উপাসনা করার মাধ্যমে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছে।
সমগ্র বিশ্বজগতের উৎসমূলে যে এক নিত্য-শাশ্বত-আধ্যাত্মিক শক্তি রয়েছে, একথা ঋষি অরবিন্দ অকপটে বিশ্বাস তো করতেনই, তিনি এটাও মনে করতেন, সেই শক্তিই আদ্যাপ্রকৃতি। Personality নামক গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ এই শক্তিকেই অসীম সত্তা বলেছেন। তবে এই অসীম সত্তা পাশ্চাত্যের সমালোচকদের দ্বারা পুষ্ট কোনও মেটাফিজিক্যাল রিয়েলিটি নয়। তাঁর ভাষায়, ‘the infinite is not a mere matter of philosophical speculation to India; it is real to her as the sunlight. She must see it, feel it, make use of it in her life. Therefore, it has come out so profusely in her symbolism of worship, in her literature.’ এই শক্তির প্রতি অর্ঘ্য প্রদান প্রকৃতপক্ষে ওই শক্তিকে অনুভব করার পাশাপাশি একাত্ম হতেই শেখায়। এই শক্তিরই একটি রূপ হল বৈদিক দেবী হৈমবতী, যিনি কতিপয় মাতৃসাধকের হাত ধরে সমগ্র বঙ্গ সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে আজ একান্ত লৌকিক দেবী জগন্মাতা জগদ্ধাত্রী। বিগত ৩০০ বছরের বাংলার ইতিহাসে এই হেমন্তকালীন চতুর্ভুজা তান্ত্রিক দুর্গার বন্দনা জগদ্ধাত্রী পুজো নামে সর্বজনবিদিত। এই পুজোর লৌকিক সূচনা হয় নদিয়ার বরিষ্ঠ কৌল্য-মাতৃসাধক ভক্ত শিরোমণি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের হাত ধরে । মতপার্থক্য থাকলেও লৌকিক মান্যতা অনুসারে, কৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বনামার দেওয়ানি বাবদ নবাব আলিবর্দি খাঁ ১২ লক্ষ টাকার বিপুল খাজনা ধার্য করলে এবং তা মেটাতে গররাজি হওয়ায় তাঁকে মুঙ্গেরে কয়েদ করে রাখা হয়। দেবীর লীলায় রাজা বন্দিদশা কাটিয়ে গঙ্গাপথে নিজশহর কৃষ্ণনগরে ফেরার সময় মাঝিদের কানাঘুষোয় বুঝতে পারেন, আশ্বিনের শারদীয় অকালবোধন পার হয়ে গিয়েছে। রাত পেরোলেই দেবীর বিসর্জন । রাজার মনে নেমে এল মহাশোকের বিষাদ। দেহ-মন-বুক ভারাক্রান্ত। দেবীর বিসর্জন যেন তাঁর বুককে নিজ মাতৃবিয়োগের মর্মস্পর্শী শেলের মতোই বিদ্ধ করতে লাগল। বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত করে ভোরের দিকে তন্দ্রাচ্ছন্ন রাজা দেবী হৈমবতীকে স্বপ্নের মধ্যে দেখলেন। সিংহপৃষ্ঠে আরূঢ় সালংকারা সহস্রকিরণ আলোকের ন্যায় জ্যোতির্ময়ী এক অপরূপা চতুর্ভুজা দেবী রূপে। লাভ করলেন অভয় বাণী এবং কার্তিক শুক্লপক্ষের যে তিথি দুর্গানবমী হিসাবে খ্যাত, সেই তিথিতে সাড়ম্বরে তাঁর নিজ প্রাসাদ মন্দিরে আগমসিদ্ধ দুর্গাক্রমে তান্ত্রিক আচার দ্বারা পুজো করার নির্দেশ। আর তখন থেকেই জগদ্ধাত্রী দেবীর আরাধনা আজও চলে আসছে।
হিমালয় দুহিতা দেবী হেমবর্ণা বলে নাম হৈমবতী। আবার হেমন্ত ঋতুতে তাঁর পুজো হয় বলে দেবীকে হৈমন্তিকাও বলা হয়। দেবীর মূর্তির বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘সিংহস্কন্ধসমারূঢ়াং রক্তবর্ণাং চতুর্ভুজাম। নানালঙ্কারভূষাঢ়্যাং রক্তবস্ত্র বিভূষিতাম্। শঙ্খ চক্র ধনুর্ব্বান বিরাজিত করাম্বুজাম্।।’ অর্থাৎ তিনি সিংহবাহিনী, তবে দুর্গার মতো জগদ্ধাত্রী দশভুজা নন, চতুর্ভুজা, নানা আভরণ ভূষিতা, অরুণকিরণবৎ বর্ণযুক্তা এবং সর্পরূপ যজ্ঞোপবীতধারিণী। তাঁর বাঁদিকের দু’হাতে থাকে শঙ্খ ও ধনু এবং ডান দিকের দু’হাতে থাকে চক্র ও কামদেবের ন্যায় পঞ্চবাণ। রক্তবর্ণের বস্ত্র তাঁর পরিধানে। তিনি সত্ত্বগুণের প্রতীক, তাই প্রথম সূর্যের মতো তাঁর গায়ের রং। অর্থাৎ দেবীর গাত্রবর্ণ শিউলি ফুলের ডাটির মতো কমলা। কিন্তু দুর্গার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে বর্তমানে তাঁর যে মূর্তিটি নির্মাণ করা হয়, সেটি হল তপ্তকাঞ্চনবর্ণ বা কাঁচা সোনার রংয়ের।
তবে পৌরাণিক উপখ্যান অনুসারে, মহিষাসুর বধের পর দেবতারা ভেবেছিলেন, দুর্গা যেহেতু তাঁদেরই সম্মিলিত শক্তির প্রকাশ, তাই অসুর বধ হয়েছে তাঁদেরই যুগ্ম শক্তিতে। ব্রহ্মার বরের সম্মান রক্ষার্থে ছিল দুর্গা নামক নারীদেহটির আবশ্যিকতা। দেবতাদের এই গর্ব দেখে পরমেশ্বরী দেবী একটি তৃণখণ্ড সবার অলক্ষে থেকে নিক্ষেপ করে পরীক্ষা করতে চাইলেন তাঁদের শক্তি। ইন্দ্র বজ্র দ্বারা সেই তৃণটি ধ্বংস করতে ব্যর্থ হলেন। অগ্নি সেই তৃণ দহন করতে পারলেন না, বায়ু অসমর্থ হলেন তা উড়িয়ে নিয়ে যেতে। বরুণের শক্তি সেই তৃণটুকুর একটি অংশও জলস্রোতে প্লাবিত করতে পারল না। দেবতাদের এই দুরবস্থা দেখে তাঁদের সামনে আবির্ভূতা হল এক পরমাসুন্দরী সালংকারা চতুর্ভুজা মূর্তি। তিনিই জগদ্ধাত্রী। জগদ্ধাত্রী এভাবে আবির্ভূতা হয়ে দেবতাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তিনিই এই জগতের ধারিণী শক্তি।
বুৎপত্তি অনুসারে জগদ্ধাত্রী শব্দের অর্থ হল, যিনি সমগ্র জগতকে ধারণ করেছেন। সপ্ত ঊর্ধ্বলোক ও সপ্ত অধঃলোক, এই চতুর্দশ ভুবনের অধিশ্বরী যিনি, তিনিই ভুবনেশ্বরী । সেই ভুবনেশ্বরীই দেবী দুর্গা । আবার এই দেবী দুর্গাই দেবী জগদ্ধাত্রী। ত্রিভুবনের পালন কর্ত্রী। জগন্নাথ সমগ্র জগতের নাথ হলেও পরমা প্রকৃতি জগদ্ধাত্রীই হলেন সমস্ত শক্তির উৎস। এই জগদ্ধাত্রীই উপাসকদের কাছে ব্যাপক অর্থে দুর্গা, কালী, ষোড়শী, ছিন্নমস্তা, চণ্ডী, নারায়ণী, বৈষ্ণবী ইত্যাদি নামে খ্যাত। নারায়ণের সঙ্গে সাযুজ্য তাঁর চতুর্ভুজ মূর্তিতে।
ভারতীয় পরম্পরায় নারীশক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিককালে যে ফেমিনিজমের কথা বলা হয়, তার বীজ বপন যে ভারতেই কোনও না কোনওভাবে হয়েছিল, তা কিন্তু স্পষ্ট। তবে এই দেবী অণুতে অণুতে বিদ্যমান। তিনিই সমগ্র জগৎ আর সকল বস্তুতে অবস্থিত। তাই জগদ্ধাত্রীর মন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘পরমাণু স্বরূপে চ দ্বানুকা দী স্বরূপিনী। স্থূলাদি সূক্ষ্ম রূপেণ জগদ্ধাত্রী নমস্তুতে।’ বর্তমানে বিশ্ববরেণ্য কোয়ান্টাম ফিজিসিস্ট রজার পেনরোজে, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, মণি ভৌমিক প্রমুখ কোয়ান্টাম জগতের রহস্য খুঁজতে গিয়ে আফশোস করেছেন এই বলে যে, কেন বিজ্ঞানীরা আধাত্মিক শক্তিকে গুরুত্ব দিলেন না! তাহলে হয়তো কোয়ান্টাম জগতের রহস্য উন্মোচনের বিষয়টি সহজ হত।
একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, দেবীমূর্তিতে ত্রিগুণের প্রকাশ, কিন্তু তার মধ্যে গুণাতীত হয়ে ব্রহ্মে বিলীন হওয়ার প্রয়াসই মূল লক্ষ্য। দেবীর বাহন পশুরাজ সিংহ রজঃগুণের প্রতীক। পদতলে হাতি তমোগুণের রূপক। রজঃগুণ দ্বারাই তমোগুণকে বশীভূত করা সম্ভব। রজঃগুণের পরিতৃপ্তি ঘটলেই প্রকাশিত হয় সত্ত্বগুণ। এই ত্রিগুণ অস্বাদনের পরেই আসে গুণাতীত ব্রহ্মের প্রকাশ। উল্লেখ্য যে, এই মূর্তিরহস্যের সঙ্গে প্রখ্যাত মনস্তত্ত্ব গবেষক স্যার সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ইদ, ইগো এবং সুপার ইগোর সাদৃশ্য পাওয়া যায়। ব্যক্তি ইদ বা সহজাত স্বভাব অতিক্রম করে ইগো বা বিবেক দ্বারা। তখন তার হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় রজঃগুণের দ্বারা পুষ্ট সম্পদ শৌর্য, বীর্য, সামর্থ ও বিবেক। সে এগিয়ে চলে সুপার ইগোর দিকে। এই পর্যায়ে তার নির্লিপ্ত মন চরমে পৌঁছয়। তার অধীনে আসে সত্ত্বগুণ দ্বারা লব্ধ সম্পদ দয়া, ক্ষমা, করুণা, ন্যায় ও ধর্ম। এর সাহায্যে সে নিজের সত্তাকে জানতে অধীর হয়ে পড়ে। তার সমস্ত বহির্মুখী শক্তি অন্তর্মুখী হয়ে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে নিজেকে আবিষ্কারের অভিপ্রায়ে। এই স্তরকে ফ্রয়েড বলছেন, ‘Self-Actualization’, তার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের সঙ্গে পরমব্রহ্ম ও পরমা প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য বন্ধন উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। একেই রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছেন, ‘মন করীকে যে বশ করতে পারে, তারই হৃদয়ে জগদ্ধাত্রী উদয় হন।… সিংহবাহিনীর সিংহ তাই হাতিকে জব্দ করে রেখেছে।’ এটাই ‘সোহম’।
