কাজল মুখার্জি

প্রতিবছর ৫ জুন পালিত হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এটা কেবল একটি দিবস নয়, বরং এক গভীর সামাজিক, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক চেতনার প্রতীক, পরিবেশ রক্ষার জন্য আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকারের দিন।
১৯৭২ সালে স্টকহোমে রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্যোগে আয়োজিত ‘মানব পরিবেশ’সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমেই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সূচনা। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবছর ৫ জুন তারিখটি বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর এক একটি দেশ এই দিবসের আয়োজক হয় এবং নির্দিষ্ট একটি থিম ঘোষণা করে।
২০২৫ সালের থিম ‘প্লাস্টিক দূষণ’। আমরা আজ এমন এক সময় দাঁড়িয়ে আছি, যখন গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রভাব পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে দৃশ্যমান। মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে। শহরের বায়ু দূষিত। উন্নয়নের নামে গাছ কাটা হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। নদী হচ্ছে আবর্জনার ভাগাড়। পাহাড়ে যথেচ্ছ নির্মাণকাজের ফলে সে সব জায়গার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তার ফলে ধস, বন্যা, হড়পা বান, এসব প্রতিনিয়ত আমরা দেখতে পাচ্ছি। প্রতিনিয়ত বিলুপ্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধবিগ্রহ, অস্ত্র পরীক্ষা এবং পারমাণবিক বিকিরণের প্রভাবে মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা, প্রকৃতি, আবহাওয়া, সকলের ওপর ভয়ংকর প্রভাব পড়ছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী গ্রহ, প্রকৃতিকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় বড় পদক্ষেপের আগে প্রয়োজন ছোট ছোট সচেতনতা, দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতনতা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলা উচিত। এসব প্লাস্টিক যেখানে সেখানে ফেলে দেওয়ার পর সেগুলি নিকাশিব্যবস্থা, প্রাকৃতিক পরিবেশে ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। কারণ এসব প্লাস্টিক সহজে নষ্ট হয় না। গৃহস্থালি বর্জ্য আলাদা করে ফেলা উচিত। জল ও বিদ্যুৎ অপচয় বন্ধ করা জরুরি, কারণ ছোট ছোট সঞ্চয় বড় ভূমিকা রাখে। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সচেতনভাবে ব্যবহার করতে হবে। গণপরিবহণ বা সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। গাছ লাগানো, পরিচর্যা ও রক্ষা করা উচিত। পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার করা, মাটি, বাঁশ, কাগজের তৈরি জিনিস ব্যবহার করা, এসব ছোট উদ্যোগ নিয়েই গড়ে উঠবে বড় পরিবর্তন। একটা নতুন শপিং ব্যাগ না কিনে কাপড়ের ব্যাগ কাজে লাগানো, নিজের বাড়ির ছাদ বা বারান্দায় গাছ লাগানো, এসব কি খুব বড় কাজ? না, কিন্তু এগুলিই পরিবেশ রক্ষার পথে ছোট ছোট পদক্ষেপ।
পরিবেশ সংরক্ষণ কোনও একক দায়িত্ব নয়। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া, গৃহবধূ, ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী, সবারই ভূমিকা রয়েছে। এসি কম ব্যবহার করা, প্লাস্টিক বোতলের বদলে মাটি বা তামার পাত্র ব্যবহার করা, দূষণবিহীন যানবাহনে যাতায়াত করা, এগুলি পরিবেশ সুরাক্ষায় কাজে লাগে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস শুধু পোস্টার বানানো, কবিতা লেখা, সামাজিক মাধ্যমে ছবি শেয়ার করার জন্য নয়, দিনটা হোক নতুন সংকল্পের। পৃথিবী আমাদের দেয় আলো, বাতাস, জল, খাদ্য ও আশ্রয়। এখন সময় এসেছে আমরা ফিরিয়ে দিই সবুজে ভরা, দূষণহীন, প্রাণবান এক ভবিষ্যৎ। সকালবেলায় বাজার থেকে ফেরার পথে হয়তো দেখতে পেলাম, রাস্তার পাশের একটুকরো সবুজ মাঠে নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে, ছোটদের খেলার জায়গায় ইট-পাথর আবর্জনার স্তূপ। তখন আমাদের কি করণীয়? আমরা চুপ করে না থেকে স্থানীয় পুরসভার হেল্পলাইনে জানাতে পারি অথবা আমরা অন্যান্য মানুষকে নিয়ে সে মাঠের এক অংশে গাছ লাগালাম। এভাবেই পরিবেশ দিবসের মূল বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক, সুস্থ পরিবেশ রক্ষা করার কাজ শুরু হোক নিজের ঘর থেকে, নিজের পাড়া থেকে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের শুধু গাছ লাগাতে বলে না, বরং আমাদের চিন্তা বদলাতে বলে। এটি আমাদের মনে করায় যে, পৃথিবী শুধু আমাদের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও। আজ যদি আমরা দায়িত্ব না নিই, আগামিকাল তাদের জন্য থাকবে না বিশুদ্ধ বাতাস, স্বচ্ছ জল, সবুজ ছায়া। তাই আমরা সবাই মিলে ৫ জুন দিনটিকে শুধু পরিবেশ দিবস হিসাবে অভিহিত না করে আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের রীতিনীতির অংশ করে দিই। তবেই আমরা সত্যিই বলতে পারব, ‘পৃথিবীকে ভালোবাসি, কারণ এটাই আমাদের একমাত্র বাসস্থান।’

