অশোক বসু

তুই একটা গরু! ছোটবেলায় এ ধরনের কথা আমাদের প্রায় প্রত্যেককেই অল্পবিস্তর শুনতে হয়েছে। আমি তার ব্যতিক্রম নই। তবে আমি ছোটবেলায় এ ধরনের সম্ভাষণ গায়ে মাখতাম না। তার প্রধান কারণ ছোটবেলা থেকেই আমি গরুর ভক্ত ছিলাম। যাকে ভালোবাসি, তার সঙ্গে নিজের অবস্থানটা একমেরুতে থাকাটা মন্দ লাগত না। হোক সে বোকা। এখনও আমার সে অবস্থানই আছে। তবে এখন গরু নিয়ে একটু অন্যভাবে ভাবতে শিখেছি।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এটা বুঝতে শিখেছি যে, গরু নিয়ে আমরা উলটোপালটা অনেক কথা বলি, যেটা মোটেই উচিত নয়। গরুর প্রতি আমাদের সব সময় কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। একজন মা তাঁর শিশুসন্তানকে জন্মের পর মাত্র কয়েকমাস নিজের বুকের দুধ খাইয়ে বড় করেন। আর গরু সেই শিশুটির সারাজীবনের দায়িত্ব নেয় দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে। একজন সাহেব গরু সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, Cow is nothing but a machine that makes grass fit for us people to eat.
পৃথিবীতে এমন কোনও যন্ত্র এখনও মানুষ আবিস্কার করতে পারেনি, যার দ্বারা ঘাস থেকে গরুর দুধের মতো সুস্বাদু ও উপকারী পানীয় পাওয়া যায়। তাহলে? গরুকে হিন্দুরা দেবতা বলে। গো- দেবতা হিন্দুদের কাছে পূজ্য।
এবার আর একটি বিষয় জানাই। ধরা যাক মহাদেবের কথা। মহাদেব হলেন দেবতা। এবার মনে করা যাক, রাস্তা দিয়ে কেউ যাচ্ছেন, যিনি আপনার অচেনা। আপনি তাঁকে যদি হঠাৎ মহাদেব বলে সম্ভাষণ করেন, তবে তিনি হয়তো অবাক হবেন, কিন্তু রেগে যাবেন না। এর কারণ মহাদেব ডাকের মধ্যে কোনওরকম অসম্মানের কিছু নেই। বরং যাঁরা ঠাকুর-দেবতাদের খুব ভক্ত, তাঁরা খুশি হবেন, কারণ তাঁকে দেবতার নাম ধরে ডাকা হচ্ছে। কিন্তু ওই ব্যক্তিকে যদি মহাদেব বলে না ডেকে গরু বলে ডাকা হয়, সে ক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে? যা ঘটবে, তা সহজেই অনুমেয়। অথচ দেখুন, গরুও দেবতা। তাহলে? এ থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায়, মানুষ কখনওই চায় না যে, তাকে কেউ বোকা বলুক।
বিবেকানন্দ বলেছেন, চালাকির দ্বারা মহৎ কাজ করা যায় না। কিন্তু মানুষ মহৎ কাজ করতে চায় না। যদি চাইত, তবে গরুকে অহরহ অপমান করে চলত না। গরুকে মানুষ যে চোখেই দেখুক, তা যে নির্বোধ, এটা মনে রেখেই গরু সম্পর্কে আমরা কথা বলি বা ভাবনাচিন্তা করি। অথচ দেখুন, গরু কত উপকারী গৃহপালিত প্রাণী। আমরা বলি, মরা হাতি লাখ টাকা। যদিও এখন অনেকে লাখ টাকার জায়গায় কোটি বলছে। আসলে বাঙালি এখন সব সময় কোটির স্বপ্ন দেখছে। গরুর মেটিরিয়াল ভ্যালু হাতির চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। গরুর শরীরের এ টু জেড মানুষের কাজে লাগে।
দুধ থেকে কী না হয়! আর গরুর চামড়া থেকে জুতো তৈরির কথা তো সবাই জানে। গরুর হাড় থেকেও কত কী পাওয়া যায়। এমনকী গরু নিয়ে অনেক বাগধারা ও প্রবাদ-প্রবচন তৈরি হয়েছে। তবে যে দু’টি প্রবচন বাঙালি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে, সেগুলি হল, ১) গরু মেরে জুতো দান এবং ২) জুতো মেরে গরু দান। গরুর সবকিছু সরল হলেও এই দু’টি প্রবচন বা প্রবাদকে ঠিকঠাক ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অনেকে জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। অনেকে ভাবে, ডিম না মুরগি, কোনটি আগে, এ ধরনের কিছু হবে। তবে একটু সাবধান হলে কোনও অসুবিধা হয় না। গরু মেরে জুতো দানের অর্থ কোনও পাপ কাজ করে পাপের ভাগ কমানোর জন্য কিছু পুণ্যের কাজ করা। আর জুতো মেরে গরু দানের অর্থ কাউকে অপমান করে তাকে ভালো কিছু দান করে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়া। তার মানে নির্বোধ গরু চালাক মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
গরু আসলে খুবই বুদ্ধিমান প্রাণী। মাঠে গরুকে ঘাস খেতে দেখে অনেক সময় তার উপর কাক বসে। গরু ইচ্ছে করলে তার লেজ দিয়ে তাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু সে প্রায়ই সেটা করে না। এর কারণ গরু জানে, কাক তার নাপিত। তাহলে গরুকে কী করে বোকা বলা যায়?
আজকাল একটি সরল প্রাণী কোনও মানুষের উপকার করলে তার চোখে সে নির্বোধ হয়ে যায়। সরলতা আর মানুষের কাঙ্ক্ষিত গুণ নয়। সে ধান্দাবাজির পূজারি। চালাকিতে বাজিমাত করতে চায়। সরলতা দেখলে হো-হো করে হেসে বলে ওঠে, ব্যাটা উজবুক!
যাই হোক, গরু মানুষের দ্বারা তার ওপর চাপানো তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও উপহাসের বোঝা নিয়ে চিরকাল মানুষের উপকারই করে যাবে। এটাই হবে মানুষের চিরকালের নৈতিক শাস্তি।
