সুদীপনারাণ ঘোষ

‘সিঁদুর’ দিয়েই হিন্দু নারীদের সিঁদুর মোছার প্রতিশোধ নিল ভারত, বীর সেনাবাহিনী। আর ১৪০ কোটি ভারতবাসীর কাছে কথা রাখলেন দেশ তথা বিশ্বের জনপ্রিয় নেতা নরেন্দ্র মোদি। ৭ মে গভীর রাতে দেশের পরাক্রমী সেনা কয়েক মিনিটেই বুঝিয়ে দিল, প্রত্যাঘাত কতটা অকল্পনীয় হতে পারে। পাকিস্তানে ঢুকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল ৯টি জঙ্গিঘাঁটি। মারা গিয়েছে কয়েকজন শীর্ষনেতা-সহ বহু জঙ্গি। পরিবার হারিয়ে এখন প্রমাদ গুনছে বহু হিন্দু নারীর চোখের জলের অভিশাপপুষ্ট কুখ্যাত জঙ্গিনেতা মাসুদ আজহার।
খন পাকিস্তান কী করবে? ভারতকে আক্রমণ করলে সমূহ বিপদ, আর না করলে দেশের অভ্যন্তরেই জ্বলে পুড়ে খাক হবে আসিম মুনির, শাহবাজ শরিফ। সিন্ধুর জল কিংবা জল-স্থল-আকাশ, কোথাও নিস্তার নেই পাকিস্তানের।
যুদ্ধ কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ পছন্দ করে না। তাতে আর্থিক, মানবিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি তো হয়ই। কিন্তু যে কোনও দেশের অধিকার আছে আত্মরক্ষার। পাকিস্তান প্রণোদিত চরমপন্থী আক্রমণে শুধু কাশ্মীরে ২ লক্ষের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কয়েকটি বিরোধী দল ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’ বলে চিৎকার করছে। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের যুক্তির বালাই নেই। তারা উদ্ভট তথ্য দিচ্ছে। তাই আমরা কিছু তথ্য ঝালাই করে নেব। জঙ্গি হামলায় পাকিস্তানের সক্রিয় ভূমিকার ১০০ শতাংশ প্রমাণ মিলেছে, অথচ বিরোধীরা কিছুতেই পাকিস্তানকে দোষ দেবে না। কীসের এত আঠা?
মুম্বই হামলা, সংসদে হানা, অক্ষরধাম মন্দির আক্রমণ হয়েছে পাকিস্তানের মদতে। অথচ বছরের পর বছর পাকিস্তান ভারত ও বিশ্বের সামনে জঙ্গিপনার সঙ্গে তাদের গাঁটছড়া বাঁধার কথা অস্বীকার করে ভালো সেজে থাকে, কারণ এদের দালাল-ঘাতকরা হয় মারা গিয়েছে, নয়তো পালিয়েছে। তবে ২৬/১১-র ঘটনা অন্যরকম ছিল। মুম্বইয়ে ২৬/১১-র হামলার সময় ঝাঁকে ঝাঁকে গুলিবর্ষণের মধ্যেও অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর তুকারাম ওম্বলে হাতে শুধু লাঠি নিয়ে জেহাদি আজমল কাসভের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাঁর বীরত্বের জন্য সতীর্থরা পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈবার জঙ্গিকে পাকড়াও করতে পেরেছিলেন। না হলে পাকিস্তান তাদের ওই হানাদারির বিষয়ে ভারত এবং অবশ্যই গোটা বিশ্বের চোখে ধুলো দিতে পারত। সেদিন থেকে সন্দেহের তির খুব সহজেই পাকিস্তানের দিকে তোলা যাচ্ছে।
আজমলকে জীবন্ত ধরা গিয়েছিল। তখন তার অন্য সহজঙ্গিরা গণহত্যা চালাচ্ছিল। কিন্তু আজমল চিৎকার করে পাকিস্তানে তাদের মুরুব্বি ও সমন্বয়কারীদের নাম বলে দিচ্ছিল। অস্বীকারের কোনও জায়গা ছিল না। কোনও সাজানো ঘটনা নয়, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহীদের কাজ বলে সাফাই নয়, কারণ পাক সংবাদমাধ্যমের কিছু সাহসী মানুষ কাসভ ও তার সাগরেদদের পাক নাগরিকত্ব ও এলইটির সঙ্গে তাদের সংশ্রবের কথা নিশ্চিত করেছেন।
ভারতের মুখ্য রফতানি তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি)। আর পাকিস্তানের মুখ্য রফতানি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ (আইটি) লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্ক, কানাডা থেকে অস্ট্রেলিয়া, সারাবিশ্বে। পাকিস্তান ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের ধূসর তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছিল। এ তালিকায় থাকার কারণ তারা সন্ত্রাসবাদকে অর্থায়ন করত। তার দু’বছর পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকা কর্তৃপক্ষ মহম্মদ শাহজেব খানকে ধরে ফেলে। আমেরিকা বলেছিল, সে কানাডায় বসবাসকারী এক পাক নাগরিক। সে বেশ কয়েক মাস ধরে সামাজিক মাধ্যমে আইএসআইয়ের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছিল ও সাংকেতিক অ্যাপ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ চালানোর উপকরণ খুঁজছিল।
শাহজেব হামলা করার জন্য এ আর অ্যাসল্ট রাইফেল, গোলাবারুদ ও অন্যান্য উপকরণ জোগাড় করতে চেষ্টা চালাচ্ছিল। সে কানাডা থেকে অবৈধভাবে আমেরিকায় ঢুকে এসব কাজ করত। সে ৭ অক্টোবর, ২০২৪ নিউ ইয়র্ক শহরের ইহুদি বসতিতে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। ইজরায়েলের ওপর হামাসের হামলার বর্ষপূর্তির দিন সেটা। আমেরিকার গোপন চররা তার নেটওয়ার্কের ভিতরে ঢুকে যায়। সে না জেনে আমেরিকান গুপ্তচরদের কিছু ধারালো ছুরি জোগাড় করে দিতে বলে, যাতে সে ইহুদিদের গলা কাটতে পারে। নিউ ইয়র্ক আদালতে জবানবন্দিতে এমনটাই জানিয়েছে গুপ্তচর সংস্থা। সে বলেছিল, সেটাই হবে ৯/১১-র পরে আমেরিকায় সংঘটিত সবচেয়ে ভয়ংকর হামলা।
৯/১১-র ঘটনায় যতটা লাদেনকে দায়ী করা হয়েছিল, ততটা পাকিস্তানকে করা হয়নি। কিন্তু শেষমেশ লাদেনকে অ্যাবোটাবাদে পাকিস্তানের সেনা ছাউনিতে পাওয়া গিয়েছে। পাক সেনার নাকের ডগায় আমেরিকার বিশেষ অভিযানে তাকে মারা হয়েছিল। ৯/১১-র ঘটনার আগে দীর্ঘ পরিকল্পনা করেছিল দু’জন পাকিস্তানি মাতব্বর। ১৯৯৩-এর ২৬ অক্টোবর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ট্রাকবোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। লক্ষ্য ছিল, একটি টাওয়ার ভেঙে অন্য টাওয়ারের উপর পড়বে ও দুটোই ভাঙবে। ছ’জন নিহত ও ১০৪২ জন আহত হয়। এটা ‘১৯৯৩ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বোমাবর্ষণ’ নামে পরিচিত ছিল। যে সন্ত্রাসবাদী ওই কাজ করেছিল, সে পাক নাগরিক রামজি ইউসেফ। বয়স ২৫ বছর। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ইউসেফ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে (ডবলুটিসি) ১-এ বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিল। সে কাজে মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশের কুশীলবের মদত পেয়েছিল। তাদের মধ্যে এক অন্ধ শেখ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে মোহিত করে রেখেছিল। বোমাবর্ষণের পরে সে পালিয়ে গিয়ে পাকিস্তানে লুকিয়েছিল। পাকিস্তানের আইএসআইয়ের প্রধান লে. জে. জাভেদ নাসিরকে পরে আমেরিকার চাপে নওয়াজ শরিফ বরখাস্ত করেছিলেন। একই পথে ৯/১১-র সময় আইএসআইয়ের প্রধান লে. জে. মেহমুদ আহমেদকে সরানো হয়েছিল।
মোটামুটি আট বছর বাদে ৯/১১-তে মহম্মদ আটা ও তার দলবল দুটো ১০০ তলা টাওয়ার কীভাবে ভেঙেছিল, তা সবাই জানে। ওই হামলার মূলচক্রী ছিল পাক নাগরিক খালিদ শেখ মহম্মদ। সে ইউসেফের নিজের মামা। তাকে পাকড়াও করা হয়েছিল পাকিস্তানে। এখন মামা-ভাগ্নে যুক্তরাষ্ট্রে জেল খাটছে— ইউসেফ কোলোরাডোয় আর খালেদ কুখ্যাত গুয়ান্তানামোয়। তাদের মানুষ ভুলে গিয়েছে, আর সেই সঙ্গে তাদের জাতীয়তাও। তারা একটি অনুকূল বাস্তুতন্ত্র থেকে আসে, যেখানে পাকিস্তানের অভিজাত লোকরাও হিংস্র চরমপন্থাকে স্বাগত জানান। কতিপয় পাক নেতা, শরিফ আর পারভেজ মুশারফ এটা স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাঁরা মূল সন্ত্রাসবাদী ডিএনএকে পালটাতে পারেননি। এর জন্ম রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীর নির্দেশিত ধর্মীয় গোঁড়ামি ও চরমপন্থা থেকে। এটা প্রকাশ পায় পহেলগাঁও কাণ্ডের আগে বর্তমান সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বক্তব্য থেকে। ২৬/১১-এ জড়িত থাকার কারণে আমেরিকা তাওয়াহুর রানাকে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণ করেছে। সে পাক সেনাবাহিনীর চিকিৎসক। পাকিস্তানের আর এক অজুহাত, ওরা প্রবাসী পাকিস্তানি। কিন্তু হালে প্রবাসী এবং পাকিস্তান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। রিজওয়ান ফারুক আর তসফিন মালিক দম্পতি ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে কালিফোর্নিয়ায় স্যান বার্নার্ডিনো গণহত্যা চালিয়েছিল, যাতে ১৪ জন নিহত হয়েছিল। তারা পাকিস্তানি চরমপন্থী বাস্তুতন্ত্রের উপজাত পণ্য।

