Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ঢেঁকির গুঁড়ির পিঠের স্বাদ অতুলনীয়

Share Links:

শ্রীমন্ত পাঁজা

গ্রামবাংলার নবান্ন উৎসব বলতে বোঝায় পৌষ সংক্রান্তির পিঠেপার্বণকে। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। চাষের জমিতে ধান উৎপাদন করে সেই নতুন ধানের চালে তৈরি পিঠে উৎসব পরম্পরা বজায় রেখে চলে আসছে।

গ্রামের মহিলাদের প্রচলিত একটি কথা রয়েছে, ‍‘পিঠে খাওয়া নয় তো, গতর খাওয়া’। অর্থাৎ পিঠে তৈরি করতে মহিলাদের ভীষণ পরিশ্রম করতে হয়। প্রথমত, চাষের জমি থেকে ধান এনে তাকে মেশিনের কলে ছাঁটাই করে চাল উৎপাদন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেই চালকে ধুঁচুনির সাহায্যে জলে ভিজিয়ে সুতির কাপড়ে রেখে জল শুকিয়ে ঝরঝরে করে নিতে হবে। তৃতীয়ত, ভেজা, অথচ ঝরঝরে চাল ধামা অথবা ব্যাগের সাহায্যে ঢেঁকিশালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু ঢেঁকিশালে নিয়ে গেলেই হবে না, সেখানে আগে থেকেই দিতে হয় লাইন। অর্থাৎ আগে থেকেই ঢেঁকিশালে চাল গুঁড়োনোর জন্য জানাতে হয়। চতুর্থত, যাঁরা ঢেঁকিতে পা দিয়ে চাপ দেন, তাঁদের কেজি প্রতি ১০ টাকা এবং যে মহিলা ঢেঁকিতে গুঁড়ো হওয়া চাল চালুনির সাহায্যে চেলে দেন, তাঁদের দিতে হয় কেজি প্রতি ৫ টাকা। এটি চাল গুঁড়ি নামে পরিচিত। তারপর যে যার গুঁড়ো হওয়া চাল ধামা অথবা ব্যাগবন্দি করে ঘরে নিয়ে যান। শুধু তাই নয়, পুলি পিঠে, পাটিসাপটা ও ভাজা পিঠে করতে গুঁড়িয়ে আনা চালকে  আবার উনুনে খোলার সাহায্যে গরম করে নেওয়া হয়। এই গরম করে নেওয়া গুঁড়িকে ভাজা গুঁড়ি বলে। পঞ্চমত, নানা ধরনের পিঠে তৈরির ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। ভাজা গুঁড়িকে একটু উষ্ণ গরম জলে আটার মতো মেখে মণ্ড তৈরি করে নেওয়া হয়। পুলি পিঠে তৈরিতে ওই মণ্ড বলের মতো করে দু’হাতের তালুতে চাপ দিয়ে পাতলা করে নিয়ে তার ভিতরে নারকেল, তরকারি, আলু মোলা, অথবা ডাল দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়। উনুনে এগুলির ২০-২৫টি প্রথমে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ির মধ্যে জল রেখে তার উপর ঝাঁজরির মধ্যে রেখে চাপা দিয়ে গরম বাষ্পের সাহায্যে ভাপিয়ে পিঠে তৈরি হয়। অর্থাৎ পিঠে তৈরি যে একটি ঝক্কির কাজ, তা বলাই বাহুল্য।

আবার আসকে পিঠে তৈরিতে কাঁচা  চাল গুঁড়ি ব্যবহৃত হয়। আসকে পিঠে তৈরিতে কাঁচা গুঁড়িকে পাত্রের মধ্যে রেখে জল দিয়ে লেইয়ের আকার তৈরি করা হয়। এই গুঁড়ির লেইকে উনুনে মাটির সরা বসিয়ে হাতার সাহায্যে পরিমাণমতো ঢেলে তা হাতলযুক্ত ছোট একটি সরা চাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেদ্ধ হয়ে গেলে তা তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পিঠে তৈরি বেশ সময়সাপেক্ষ, তা মা, কাকিমা, পিসিমা, ঠাকুমারদের কাছ থেকে জানা যায়।

বর্তমানে গ্রামগঞ্জে ঢেঁকির দেখা মেলা ভার। তাই এখন শহর ছাড়িয়ে শহরতলি ও গ্রামগঞ্জেও হাটবাজারে মুদির দোকানগুলিতে বিক্রি হচ্ছে পিঠে তৈরির জন্য মেশিনে গুঁড়ো করা চাল। শুধু হাটবাজার নয়, পাড়ার অলিগলিতে ছোটখাটো মুদির দোকানেও মিলছে এ ধরনের কলে ভাঙানো চাল। আবার এও দেখা যাচ্ছে, অনেকেই যে যার পছন্দমতো চাল কিনে তা মেশিনে ভাঙিয়ে আনছে পিঠে তৈরির জন্য। সেখানেও বিশাল লাইন। কারণ পৌষ পার্বণের মূল অঙ্গই হল পিঠে। গ্রামবাংলায় পৌষ পার্বণ কথাটির চেয়ে পিঠেপার্বণ বলার রেওয়াজটাই বেশি। যদি দেখা যায়, ঢেঁকি ও মেশিনের গুঁড়ি নিয়ে লড়াই চলছে, তবে একথা বলতেই হবে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্বিতীয়টি প্রথমটিকে অনেকটাই ব্যাকফুটে ফেলে দিয়েছে। অধিকাংশ মহিলা  বলছেন, ঢেঁকিতে চাল গুঁড়ো করতে গেলে সময় এবং অর্থ, দুই-ই বেশি লাগে। জেট গতির যুগে ঢেঁকি আজ বেশ খানিকটাই ব্রাত্য, এ কথা বলাই যেতে পারে। তবে ভোজনরসিক বাঙালি একথাও বলছে, ঢেঁকির গুঁড়ির পিঠে অনেক বেশি সুস্বাদু। স্বাদের দিক দিয়ে মেশিনের গুঁড়ির পিঠেকে ঢেকি যে সহজেই বোল্ড আউট করবে, তা একবাক্যে বলা যায়।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए