অজয় ভট্টাচার্য

গত বছর খবরের শিরোনামে উঠে এসেছিল মধ্যপ্রদেশের কোতোয়ালি এলাকার বাসিন্দা নন্দু বসু ও তাঁর সহযোগী প্রদীপ বসুর নাম— জান্তব প্রবৃত্তিসম্পন্ন দু’টি মানুষ। এক ডজন কুকুরের চার পা ও মুখ বেঁধে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে টোটোয় পাড়ি দিয়েছিলেন তাঁরা। সাতনায় পৌঁছলে স্থানীয় মানুষের সন্দেহ হয়। স্থানীয় মানুষের মানবিক প্রচেষ্টায় নিশ্চিত সলিলসমাধির হাত থেকে বেঁচে যায় সারমেয়গুলি।
অভিযুক্তদের এ আচরণকে মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ বলে এড়িয়ে গেলে ভুল হবে। এমনই পাশবিক প্রবৃত্তির শিকার কমবেশি অনেকেই। পাশবিক প্রবৃত্তি কোথাও সুপ্ত, কোথাও প্রকট। ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব তো সে কথাই বলে। ধর্মীয় কারণে পশুহত্যা, সেও তো কম অপরাধ নয়!
খাদ্যের প্রয়োজনে জীবহত্যা, সেটা তো সংগ্রাম করে বেঁচে থাকারই একটি অঙ্গ। কিন্তু পাশবিকতা সেখানেও কম নেই। অস্ট্রেলিয়ার আইকনিক প্রতীক ক্যাঙ্গারু। তবুও প্রতিবছর লাখ লাখ ক্যাঙ্গারু হত্যার অনুমতি রয়েছে সেখানে। এ হত্যা সংঘটিত হয় রীতিমতো সরকারি ছাড়পত্রে। ২০২০ সালে প্রায় ১০ হাজার বন্য উটকে হত্যা করে অস্ট্রেলিয়া। সমাজকর্মীদের অভিযোগ, এ কার্যক্রম নিষ্ঠুর ও বাণিজ্যিক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। এ নিয়ে তাঁদের ক্ষোভের অন্ত নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
সরকারি যুক্তি হল, সুস্থিতি বজায় রাখার স্বার্থে এ হত্যাকাণ্ডের নিতান্ত প্রয়োজন। দক্ষিণ কেনিয়া এবং উত্তর তানজানিয়ায় বসবাসকারী মাসাই উপজাতির মানুষ বিশেষ অনুষ্ঠানে গরুর রক্ত পান করে। গরুর শিরায় বাঁশের তৈরি নল ঢুকিয়ে রক্ত চুষে খায়। এশিয়া ও চিনের বাজারের চাহিদাকে মাথায় রেখে ফি-বছর আফ্রিকায় ৩০ হাজারেরও বেশি হাতি শিকার করা হয়। সেখানে প্রতি কেজি হাতির দাঁতের মূল্য ১ হাজার মার্কিন ডলার। জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর একটি উক্তি ধার করে বলা যায়, ‘ম্যান সার্ভস দ্য ইন্টারেস্টস অব নো ক্রিয়েচার একসেপ্ট হিমসেল্ফ।’
সুতরাং পাশবিক প্রবৃত্তিটি সকলের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। তথাপি জান্তব প্রবৃত্তির হাতছানি এড়িয়ে যতটুকু উত্তরায়ণের পথে সঞ্চালিত করা যায়, সে অনুযায়ী গড়ে ওঠে মানুষের রুচি ও সৌন্দর্যবোধ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পে ভিখুর চরিত্রে এমনই এক জান্তব প্রবৃত্তি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। লুণ্ঠন, হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ, কোনওটিতেই ভিখুর অরুচি ছিল না।
অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায়, এক-দু’জন ব্যক্তি মিলে অন্য কাউকে হত্যা করলে তাকে বলা হয় খুন। দশ বা দশের অধিক ব্যক্তি একই অপরাধ করলে তাকে বলে গণহত্যা। হাজার হাজার মানুষের দ্বারা একই অপরাধ সংঘটিত হলে তাকে বলে বিপ্লব। নামের মাহাত্ম্যে অপরাধের সংজ্ঞা বদলে যায়। দস্যু-দানব, সুর-অসুর— সবই মানুষের বিভিন্ন রূপ।


I am afraid human race is inviting total destruction. How can we prevent that?