সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

হিটলারও কাঁদতেন। হ্যাঁ, ঠিক পড়ছেন। উদ্বেলিত জনতা তাদের প্রিয় নেতা হিটলারের জ্বালাময়ী, জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত তেজোদৃপ্ত ভাষণ শুনতে শুনতে কাঁদত, তিনিও কাঁদতেন। জার্মানির কী খারাপ সময় যাচ্ছে! এমনটা হওয়ার কথা নয় তো। জার্মানি কীসে কম? শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, দর্শন, বিজ্ঞান, নৃত্য, স্থাপত্য, সব বিষয়ে যে কোনও দেশের কাছে ঈর্ষণীয় সব অর্জন করা আছে তাদের। কেন এমন হল? একটু পিছনে যাওয়া যাক।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় ঘটে এবং সেদেশকে বিরোধীদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়। ভার্সাই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যে, যুদ্ধের জন্য জার্মানি দায়ী। জার্মানিকে বাধ্য করা হয় অস্ত্রত্যাগ করতে এবং সব সামরিক দখলদারি ছাড়তে। শুধু জার্মানিকেই নিজ দেশের একটি বড় অংশ ছেড়ে দিতে হয় এবং অন্য দেশগুলিকে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এভাবে অবমানিত ও মুখ পোড়ানো, স্বল্পাহারে ভোগা, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি জাতির মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল। তাদের কোনও শক্তিশালী সংবিধান ছিল না। এর ফলে সেখানে বিপুল অস্থিরতা তৈরি হল। তিক্ততা, কলহ, বিদ্রোহ এবং নৈতিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় নেমে এল। তারা যন্ত্রণার কারণ খুঁজতে লাগল। একের পর এক সরকার ও শাসককে উৎখাত করতে থাকল এবং এক চরম কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জিতল।
১৯১৯ সালে সংসদীয় প্রজাতান্ত্রিক সরকার গঠন হল ভিমারে। সামাজিক পুনর্গঠন করা, রাজনৈতিক অস্থিরতা কমানো এবং অর্থনৈতিক অচলাবস্থা কাটানো, এসব কাজে ১২ বছর লেগে গেল দেশটির। মানুষজন অনৈক্যবদ্ধ, হতাশাগ্রস্ত, যন্ত্রণাক্লিষ্ট ও কলহপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই সংসদীয় ব্যবস্থা তাদের পছন্দ ছিল না। ৩০টি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী তৈরি হল। আর্থিক কেলেঙ্কারি ও বিপুল মন্দার জোড়া ফলায় জেরবার দেশ। জীবনের সব ক্ষেত্রেই ওলটপালট চলছিল। শিক্ষায় এল চরম ঔদাসীন্য। ধর্মনিরপেক্ষ, প্রায় অযৌক্তিক বস্তুবাদী, ইন্দ্রিয়বাদী দর্শনের কারণে কোনও রাষ্ট্রীয় বা সামরিক শৃঙ্খলা ছিল না। এর ফলে বিক্ষোভকারী ও স্বঘোষিত পান্ডাদের ব্যক্তিগত খেয়ালিপনা চরিতার্থ করার অবাধ মৃগয়াক্ষেত্র হয়ে উঠল দেশটি।
সে পরিস্থিতিতে গোটা জাতি উন্মুখ হয়ে ছিল একজন নেতার জন্য, যিনি জাতির হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করবেন এবং চরম বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি থেকে বের করে জাতির মধ্যে আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করবেন। জার্মানি তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া রূঢ় সব শর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। তারা নিস্পৃহ বিক্ষোভ সংগঠন করে প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলছিল। তাতে বিরোধী দেশগুলি ক্রুদ্ধ হচ্ছিল, যার মধ্যে ছিল ফ্রান্স। জার্মানির রুর এলাকা ফ্রাঙ্কো-বেলজিয়াম বাহিনী দখল করল। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ধ্বংস হল। আর ১৯২৩ সাল নাগাদ জার্মানি একটি দেউলিয়ায় পরিণত হল। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বদলে গরম গরম বক্তৃতা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও ষড়যন্ত্র মাথাচাড়া দিল। নির্বাচনের পর নির্বাচনে চরমপন্থীরা শক্তি অর্জন করছিল।
১৯৩২ সালের আগস্টে নির্বাচনে Nationalsozialistische (সংক্ষেপে নাৎসি, যার অর্থ জাতীয়তাবাদী সমাজবাদী) ৬০৮টির মধ্যে ২৩০টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হয়েছিল। কিন্তু ওই দল গণতান্ত্রিক ধাঁচে সংসদীয় আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে শক্তি বাড়াল না। শক্তি বাড়াল এক ব্যক্তির মনোমুগ্ধকর হিপ্নোটিজমের মাধ্যমে। তাঁর নাম হিটলার। তিনি কারসাজি করে দলকে কব্জায় নিলেন এবং তাঁর গেরিলা বাহিনী ‘স্টর্ম ট্রুপার’ বা ‘ঝটিকা বাহিনী’র ওপর দাপটের মাধ্যমে ক্ষমতা জাহির করলেন।
হিটলার তাঁর মাই স্ট্রাগল বা মেইন কম্ফ বইয়ের প্রারম্ভিক পৃষ্ঠায় সুস্পষ্টভাবে লিখেছিলেন, তাঁর নীতি কী হবে। তিনি লেখেন, এমন একটি রাষ্ট্র তিনি নির্মাণ করবেন, যার ভিত হবে বিশুদ্ধ জার্মান জাতীয়তা এবং জার্মান রক্ত। অন্য কিছু বিবেচনা করা হবে না।
