অমিতাভ ভট্টাচার্য
গীতিকার এবং গল্প ও চিত্রনাট্য লেখক

সমস্যার শুরুটা অনেক আগেই হয়েছিল সুরকার শ্যামল মিত্রের হাত ধরে। তা নিয়ে তার পুত্র সৈকত মিত্রকে অনেকবার বলতেও শুনেছি। শ্যামল মিত্র অমানুষ ফিল্মে প্রথমবার বাংলা সিনেমার গান গাইয়েছিলেন কিশোরকুমারকে দিয়ে। সে গান হিট হয়। পরে সেটাই ট্রেন্ড হয়ে যায়। বাংলা সিনেমার গানেও পশ্চিমবঙ্গের গায়ক-গায়িকাদের সুযোগ কমে আসে।
আটের দশকের প্রায় শেষ ভাগ পর্যন্ত বাংলা সিনেমার গানে কিশোরকুমার, অমিতকুমার, লতা মঙ্গেশকার, আশা ভোঁসলেদের রমরমা দেখেছি। এমনকী মহম্মদ রফিকে দিয়েও বাংলা গান গাওয়ানোর চেষ্টা হয়েছে। তার ফল খুব একটা ভালো হয়েছিল বলে মনে হয় না।
এদিকে তখন জলসার আসর মাতাচ্ছেন তথাকথিত কণ্ঠী গায়ক-গায়িকারা। সিনেমার গান থেকে তাঁরা আগেই ব্রাত্য হয়ে গিয়েছিলেন। তার ওপর আধুনিক বাংলা গানের ধারাও সে সময় আটকে গিয়েছিল। ফলে বাংলা গানের খুব খারাপ সময় শুরু হয় আটের দশকের মাঝামাঝি। ছিটকে আসা দু’-একটা গান ছাড়া আমার যা মনে পড়ছে, সবই ফিল্মের গান। আধুনিক গান বলতে যেগুলি কানে আসছিল, তা ছিল মূলত রাহুল দেব বর্মনের তৈরি। আশা ভোঁসলে বা সুরকারের নিজের গাওয়া। সেসব গানের কথা অনেকটাই ছিল কাজ চালানোর মতো। গুণমান মোটেও উন্নত নয়। এই বদ্ধ জলাশয়ের দশা কাটল একদম নয়ের দশকের শুরুতে। ‘ও গানওয়ালা, আর একটা গান গাও, আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই।’ গেয়ে
উঠলেন নগর বাউল সুমন চট্টোপাধ্যায়। এপার-ওপার দুই বাংলা ভেসে গেল সে গানে। অ্যালবামের নাম ‘তোমাকে চাই’। ভক্তরাও দু’হাত তুলে বলে উঠলেন আমরাও ‘তোমাকে চাই’। অনেক কাল পরে আমাদের নতুন গান হল। বাংলা গানের জোয়ার ফিরে এল।
অন্য পোস্ট: বাংলা গানের হালহকিকত
ঠিক ওই সময় বাংলা সিনেমার খবর শহুরে লোকরা প্রায় রাখতেন না। ফলে সিনেমার গানে কী হচ্ছে, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না। বাংলা সিনেমার মতোই বাংলা গানও শহর আর গ্রামে ভাগ হয়ে গেল। শহর যখন শুনছে ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল মোমবাতি বগ্গা, গ্রামের লোকরা তখন শুনছে কিছুটা পুরোনো গান, ‘আর কত রাত একা থাকব’। এ দূরত্বটা বাড়ছিল। সুমনের পর নচিকেতা এলেন, অঞ্জন এলেন। শিলাজিৎ এলেন। আবার শুরু হল ব্যান্ডের রমরমা। কিন্তু সে সময় আবার একটি নতুন ধারা শুরু হল। ইন্দ্রনীল সেন নিয়ে এলেন রিমেক গানের ধারা। শহুরে বাঙালি আবার ভাগ হয়ে গেল। একদল শুনতে শুরু করল জীবনমুখী গান। অন্য দলের পছন্দ তখন ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়, এ কী বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু’। কিন্তু সে ধারাও শুকিয়ে গেল।
