গৌতম দে
![]()
লেখক গল্প এবং উপন্যাস লেখেন। সে লেখার ওপর ভিত্তি করে যখন সিনেমা তৈরি হয়, তখন তা লেখকের আখ্যানকেও ছাপিয়ে যায় সে ছবির পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গির সুনিপুণ শিল্পভাবনার প্রসাদগুণে। বিশ্বজুড়ে এমন অনেক প্রণম্য চিত্রপরিচালক রয়েছেন, যাঁদের সিনেমা এখনও ভুলতে পারা যায় না। সেসব ক্লাসিক পর্যায়ের সিনেমাগুলি নিয়ে আজও আলোচনা হয়। আগামী দিনেও হবে। এ প্রসঙ্গে আমাদের দেশের বিশ্ববন্দিত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের কথা উল্লেখ যেতে পারে। তিনি কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আম আঁটির ভেঁপু’ এবং শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর রূপকথা কাহিনি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’কে কালজয়ী শ্রেষ্ঠ বাংলা সিনেমা হিসাবে তুলে ধরেছেন বিশ্বের দরবারে। ‘পথের পাঁচালী’ এবং ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন সিনেমা দু’টি কাহিনিকে ছপিয়ে গিয়েছে পরিচালকের সুনিপুণ চিন্তন, নির্মাণ, ভাবনার কাছে। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমাটি কতবার দেখেছি, তার হিসাব নেই। যতবার দেখি, ততবারই নতুন লাগে। নিত্যনতুন চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে মনোজগৎ। সাম্প্রতিক অতিমারির সময়ের সঙ্গেও কোথায় যেন মিল খুঁজে পাই।
আমরা জানি, গুপী আমলকী গ্রামের ছেলে। বাঘা হরিতকী গ্রামের। তারা উভয়েই অপমানিত এবং গ্রাম থেকে বিতাড়িত। তার কারণও কারও অজানা নয়। তারপর তারা নির্জন গভীর বাঁশবনে আশ্রয় নিয়েছিল। কেউ কাউকে চিনত না। অবশেষে পরিচয় হল। শেষ পর্যন্ত এই অদ্ভুত নির্জন বহুমাত্রিক নৈঃশব্দপূর্ণ বাঁশবনে আশ্রয়কালে হঠাৎ একটু একটু করে পরিবেশ পালটে যেতে লাগল। এক মায়াবী আলোয় ভরে গেল চারপাশ। ক্লাসিক নৃত্যের সুর আর তালের মূর্চ্ছনায় একে একে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভূতের আগমন ঘটল। তাদের কারও কারও হাতে ধারালো আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। কারও হাতে আত্মরক্ষার্থে ঢাল। যুদ্ধের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় নৃত্যরত। আবার কারও হাতে একতারা। হয়তো কোনও বিপ্লবী দেশাত্মবোধক গান গাইতে গাইতে শহিদ হয়েছেন।
এভাবে অনেক কালো-ধলো, মোটা-রোগা, বেঁটে ভূতের আগমনে গোটা বাঁশবন এক মায়াবী আলোর চাদরে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। অসম্ভব সুন্দর দৃশ্যের বাতাবরণ। সত্যজিৎ রায়ের এই চিন্তাধারার কাছে আমাদের বারবার নত হতে হয়। যুদ্ধের পরম্পরার একটার পর একটা দৃশ্য তিনি তৈরি করেছেন নিপুণতার সঙ্গে, যাতে দেশের ইতিহাসের পাতা একের পর এক চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সাম্রাজ্য দখলের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। খুব সাবলীলভাবে তিনি সাদাকালো পর্দায় তুলে ধরেছেন। কী অসাধারণ কথা তিনি বলতে চেয়েছেন! আমাদের দেশ কত যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন সম্প্রদায় মানুষের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। ভূত হয়ে সত্যজিতের হাতে তারা ধরা দিয়েছে। নৃত্য ও সুরের মাধ্যমে তার নিপুণ বিশ্লেষণও করেছেন, যা আজও সমান তালে দেশ ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে বিদ্যমান। আজও সমান তালে দেশে দেশে চলছে জ্যান্ত ভূতদের বৈরিতা। এখানেই সত্যজিৎকে বিশ্বের তারড় চলচ্চিত্রকারদের থেকে অনায়াসে আলাদা করে চেনা যায়। তারপর দেখলাম ভূতের রাজার আগমন। গুপী-বাঘার কাছে নিমেষে আপন হয়ে উঠল। তাদের নাম-গোত্র এবং কী কারণে তারা নিঝুম বাঁশবনে আশ্রয় নিয়েছে, তাও ভূতের রাজা জানে। শেষমেশ ভূতের রাজা তিনটি বর দিয়ে তাদের ইচ্ছাপূরণ করেছিল।
সিনেমাটি ১৯৬৮ সালে নির্মাণ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। তার মানে সিনেমাটির বয়স এখন ৫৩ বছর। উপেন্দ্রকিশোর রূপকথা গল্প হিসাবে লিখেছিলেন। কিন্তু সত্যজিৎ রায় সে পথে হাঁটেননি। সুকৌশলে তিনি রাজনৈতিক বার্তা রূপকথার মোড়কে সুনিপুণভাবে বুনেছেন। সিনেমাটি সে বার্তা বহন করে চলেছে। এটি সব বয়সের মানুষের কাছে আজও সমানভাবে জনপ্রিয়।
ছবিটি যত এগিয়েছে, রূপকথার মোড়কের পরতে পরতে তত একটি রাজনৈতিক ছবিতে পরিণত হয়েছে। আপন দুই ভাই। এক ভাই শুন্ডি। নরমপন্থী। যুদ্ধ চায় না কিছুতেই। গান ভালোবাসে। ফুল ভালোবাসে। পাখির সুর ভালোবাসে। ফসল ভালোবাসে। সব সময় রাজ্যের প্রজাদের মঙ্গল চায়। আর এক ভাই হাল্লা। চরমপন্থী। যুদ্ধবাজ। গুপ্তচরের মাধ্যমে জানতে পারে শুন্ডির কোনও সৈন্য নেই। আধুনিক অস্ত্রও নেই। হাতি নেই। ঘোড়া নেই। উট নেই। নেই-এর তালিকা দীর্ঘ। অতএব দখল করো। হাল্লা দখল করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রজারা সর্বক্ষণ হাল্লার ভয়ে তটস্থ। ষড়যন্ত্রকারী মন্ত্রীমশাইয়ের নির্দেশে জাদুকর বরফির ল্যাবরেটরিতে তৈরি বটিকা সেবনে উজ্জীবিত হয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণে হাতে বর্শা নিয়ে ছুটে যায় অলীক মানুষের দিকে, মানে শুন্ডির দিকে। বর্শার আঘাতে তাকে শতছিন্ন করতে চায়। মন্ত্রীসান্ত্রীরা খুব খুশি হয়। মুরগির ঠ্যাং চিবোতে চিবোতে নতুন নতুন ফন্দিফিকির আঁটে। অন্য সময় হাল্লা নিষ্পাপ শিশুর মতো সরল, যেন পিঁপেড়ে মারলেও সে কষ্ট পাবে। এখনই কেঁদে ফেলবে। রাজা তখন মন্ত্রীসান্ত্রীদের কাছে খেলার পুতুল। ফের বরফির ডাক পড়ে। ফের বটিকা সেবন। ফের রাজা অস্ত্র হাতে নিয়ে জেহাদে মেতে ওঠে। জিজ্ঞেস করে, সেনাপতি যুদ্ধের প্রস্তুতি কেমন চলছে?
— ভালোই তো, ভালোই তো।
— তাহলে সঙের মতো এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ঝাঁপিয়ে পড়ো। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। নিকেষ করো শুন্ডিকে।
তার রাজ্যে প্রজারা কেন কথা বলে না? গুপী-বাঘার এ প্রশ্নে শুন্ডির রাজা বলে, দশ বছর আগে এক মহামারিতে
তাদের বাকশক্তি হারিয়ে গিয়েছে।
পরিশেষে গুপী-বাঘার সুচতুর প্রচেষ্টায় রাজ্যে শান্তি ফিরে আসে। আমজনতা নিজেদের মনের কথা বলতে পেরে খুশি হয়। আনন্দ করে। খুশি হয় শুন্ডি। ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলে, কত দিন পর দেখলাম তোকে। ভাই আমার।
হাল্লা বলে, ভাবতেই পারছি না, তোর রাজ্য দখল করতে যুদ্ধে নেমেছি। আমার যে কী ভালো লাগছে আজ!
হয়তো কেউ কেউ বলবেন, যুদ্ধ মানে ব্যবসা। অস্ত্রের ব্যবসা। আবার যুদ্ধ মানে কিন্তু শত শত নিরীহ মানুষের মৃত্যুও বটে! ঠিক তখনই মহান চলচ্চিত্র স্রষ্টা সত্যজিৎ রায় সর্বকালের জন্য গুপীর গলায় গেয়ে ওঠেন, ‘ওরে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কী, তা বল।’ এখানেই সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সৃষ্টির সার্থকতা।

Gu Ga Ba Ba nishchoy-i osadharon antorjatik maner movie. Hoyto Satyajit Ray-er onyotomo shrestho kirti. Tobe amar ekta chhotto proshno ba onujog achhe. Proshnota hochchhe….Satyajit Ray ei chhobir kahinikar hisebe Upendrakishorer nam dilen keno! Apnader modhye jara rupkothata porechhen ebong cinematao dekhechhen tara bodhoy bujhte parchhen ami keno ei kotha bolchhi.