ভাস্কর সেনগুপ্ত

অধিকাংশ মেলাই কোনও না কোনও পূজাপার্বণ ঘিরে অনুষ্ঠিত হয়। অগ্রদ্বীপের গোপীনাথের মেলা সে তালিকায় এক বিরল সংযোজন। এ মেলার আয়োজন হয় শ্রীচৈতন্যের অন্যতম পার্ষদ গোবিন্দ ঘোষের শ্রাদ্ধদিবস উপলক্ষে। আরও উল্লেখ্য, মানুষের কল্পনাশ্রিত বিশ্বাসে দেবতা এখানে তাঁর মানুষ পিতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। তাই এই মেলা গোবিন্দ ঘোষ ঠকুরের শ্রাদ্ধমেলা নামেও পরিচিত। গৌড়ীয় বৈষ্ণবমার্গের এক ট্র্যাজিক নায়ক সাধক গোবিন্দ ঘোষ। একসময় শ্রীচৈতন্যের এই বিশ্বস্ত সহচর পরবর্তীকালে বৈষয়িক আসক্তির জন্য শ্রীচৈতন্যদেব দ্বারা পরিত্যাজ্য হয়ে অগ্রদ্বীপের গঙ্গার ধারে বসবাস করতে থাকেন।
ঘটনাটি সংক্ষেপে জানানো প্রয়োজন। চৈতন্যদেব চলেছেন কাটোয়া থেকে বৃন্দাবন। সঙ্গে আছেন গোবিন্দ। অগ্রদ্বীপের কাছে এসে বললেন, এখানে প্রসাদ পাব। প্রসাদ পাওয়ার পর মুখশুদ্ধি চাইলেন। গোবিন্দ গ্রাম থেকে হরিতকি নিয়ে এলেন। সেদিন চৈতন্যদেব অগ্রদ্বীপে থেকে গেলেন। পরদিন প্রসাদ পাওয়ার পর যখন মুখশুদ্ধি চাইলেন, গোবিন্দ সঙ্গে সঙ্গে হরিতকি বের করে দিলেন। চৈতন্যদেব জিজ্ঞেস করলেন, গতকাল এত বিলম্ব হয়েছিল, আর আজ এত শীঘ্র কীভাবে পেলে? গোবিন্দ বললেন, আপনার সেবার সুবিধার্থে একটি সঞ্চয় করে রেখেছিলাম। চৈতন্যদেব অত্যন্ত বিরক্ত হলেন। বললেন, সন্ন্যাসী হয়ে সঞ্চয় করেছো! আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম। গোবিন্দ চৈতন্যদেবের চরণে পরে ক্রন্দন করতে থাকলেন। প্রভু আমাকে ত্যাগ করবেন না। আমি আপনাকে ছাড়া একমুহূর্ত বাঁচব না। আমাকে দয়া করে সঙ্গছাড়া করবেন না। চৈতন্যদেব বললেন, তুমি সংসার করো। তুমি একটা জিনিস পাবে। আমি আসব।
কয়েক মাস পরে গঙ্গাস্নান করে ওঠার সময় গোবিন্দর মাথায় কী একটা স্পর্শ করল। গঙ্গার ধারে ফেলে ঘরে ফিরলেন। দেখলেন, চৈতন্যদেব আঙ্গিনা আলোকিত করে দাঁড়িয়ে আছেন। অবাক হয়ে বললেন, প্রভু আপনি!
চৈতন্যদেব বললেন, যেটা গঙ্গার ধারে ফেলে এসেছ, ওটা নিয়ে এসো।
গোবিন্দ ছুটতে ছুটতে গেলেন। দেখলেন একটি কষ্টিপাথর। মাথায় করে ঘরে আনলেন। চৈতন্যদেব বললেন, বিকেলে এক ভাস্কর আসবে। তাকে দিয়ে গোপীনাথের বিগ্রহ বানিয়ে সেবা করো। ওতে তোমার পরম প্রাপ্তি হবে। গোবিন্দ গোবিন্দর সেবা করে সারা জীবন অতিবাহিত করলেন। একটি সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে সংসার। দু’জনেরই অকাল মৃত্যু হল। শেষ জীবন ভগবানের কাছে নিবেদন করলেন।
গোবিন্দ বললেন, আমার পারলৌকিক ক্রিয়া কে করবে?
ভগবান বললেন, আমি করব।
এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ মেলার জন্মরহস্য। সে হিসাবে এই মেলা প্রায় সাড়ে ৪০০ বছরের পুরোনো।
হাওড়া-কাটোয়া লাইনে কাটোয়ার তিনটি স্টেশন আগে অগ্রদ্বীপ। গঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা অগ্রবর্তী গ্রাম হিসাবে এই নামকরণ। গ্রামটি স্টেশন থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে গঙ্গার অপর পারে। বর্ধমান জেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও জায়গাটি নদিয়া ঘেঁষা। গঙ্গা এখানে অপ্রশস্ত খালের মতো।
দোল পূর্ণিমার পরের কৃষ্ণা একাদশীতে ঘোষ ঠাকুরের প্রয়াণতিথি অনুসারে ‘চিঁড়ে মহোৎসব’-এর মধ্য দিয়ে মেলার শুরু। ওইদিন মন্দির থেকে গোপীনাথ বিগ্রহ নিয়ে আসা হয় গোবিন্দ ঘোষের সমাধি মন্দিরে দেবতার হাত দিয়ে মানব পিতার কুশ ও পিণ্ডদানের উদ্দেশ্যে। দেবতাকে কাছা পরিয়ে তাঁর মানব পিতার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের এমন বিরল নমুনা চাক্ষুষ করতে হলে আসতে হবে গ্রামবাংলার এই মেলা প্রাঙ্গণে। প্রচলিত নিয়ম মেনে আগত পুণ্যার্থীদের সঙ্গে গ্রামবাংলার মানুষও ওইদিন অরন্ধন পালন করেন। দ্বিতীয় দিনে অন্ন মহোৎসব, তৃতীয় দিনে গঙ্গাস্নান, চতুর্থ দিনে স্থানীয়ভাবে পালিত গোপীনাথের দোলের মধ্য দিয়ে মেলা শেষ হয়।
মেলাটি নিতান্তই গ্রামীণ মেলা। আগত তীর্থযাত্রীরাও কাছে-দূরের গ্রামীণ মানুষ। অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষ। বাণিজ্যিক দিকটাও তেমনই। বেশ কিছু দোকান বসলেও বেশির ভাগই হরেক মাল ১০ টাকা গোছের। ব্যতিক্রম শুধু কাটোয়ার বিখ্যাত কাঠের পুতুল। গ্রামবাংলায় এখনও এই পুতুলের ভালোই চাহিদা। শিল্পীদের সঙ্গে তাঁদের পরিবারও উপস্থিত থাকে এই মেলায়।
সব মিলিয়ে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয় এই মেলায়। কারও কারও মতে, সংখ্যাটা ৫-৬ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। যত দিন যাচ্ছে, ততই নতুন করে জনজোয়ারে ভাসছে অগ্রদ্বীপের মেলা। তবে গঙ্গার ভাঙনের করাল ভ্রুকুটি এই মুহূর্তে মেলার ভবিষ্যতে প্রশ্নচিহ্ন রেখে দিয়েছে।
সত্যপুরুষ উপেন্দ্রমোহনের জীবনেও অনুরূপ ঘটনা আছে। তাঁর পূর্বপুরুষ রামগোবিন্দ সেন অল্প বয়সে গৃহত্যাগ করেছিলেন। দীর্ঘদিন সন্ন্যাস জীবন যাপন করার পর তাঁর গুরুদেব একদিন তাঁকে ডেকে বললেন, তুমি গৃহে ফিরে যাও। তোমার বংশে একজন আসবেন। তিনি তোমার উদ্ধারের ব্যবস্থা করবেন। ভগ্নহৃদয়ে তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন। ভাইরা তাঁর সম্পত্তি ফেরত দিতে চাইলে তিনি বললেন, আমি বান্তাসি হতে পারব না। যা দান করেছি, তা আর ফেরত নিতে পারব না। গঙ্গার ধারে একটি কুঠির বানিয়ে রাধামাধবের বিগ্রেহের সেবা করতে লাগলেন। গুরুর নির্দেশ অনুযায়ী বিবাহ করলেন। বহুদিন অতিবাহিত হল, কিন্তু কোনও সন্তান হল না। ভাবলেন, সেই পুরুষ তো এলেন না! আমার উদ্ধারের ব্যবস্থা তো হল না! হতাশায় জীবন প্রদীপ অস্তমিত। একসময় তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলেন। স্বামীকে জানানোর অবকাশ হল না। রামগোবিন্দকে ঠাকুর বললেন, আমি তোমার শ্রাদ্ধ করব। ভাঙামোড়া গ্রামে রামগোবিন্দ সেবিত বিগ্রহে সন্তানের ন্যায় কুশের অঙ্গুরীয় পরিয়ে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান হল। শ্রাদ্ধ শেষে অঙ্গুরীয় আপনা হতে খসে পড়ল। গ্রামসুদ্ধ লোক হইহই করে উঠল। প্রতিবছর এই অনুষ্ঠান দেখতে ভাঙামোড়া গ্রামে বহু লোকসমাগম হতে থাকল। দীর্ঘ ১৫০ বছর গোবিন্দ রামগোবিন্দর সেবা করলেন। তারপর এই সেবা বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যায়। উপেন্দ্রমোহনের কাছে এই সংবাদ এল। তিনি তৎক্ষণাৎ টাকা সংগ্রহ করে মন্দিরের পুনর্নির্মাণ ও সেবার ব্যবস্থা করলেন। ঠাকুর উপেন্দ্রমোহনকে জানালেন, আমাকে আর বাঁধিস না। তাই উপেন্দ্রমোহন তা আর করলেন না।
