ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
প্রফেসর, সিধু-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
![]()
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গে বিভক্ত করার ঘোষণা করেছিল। তার পিছনে মূল রাজনৈতিক অভিসন্ধি ছিল হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে বিভাজন তৈরির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা। এ প্রসঙ্গে এইচ এইচ রিজলে সাহেবের উক্তি ছিল, ‘Bengal united is a power, Bengal divided will pull in several ways.’ সে কারণে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিতকরণের দ্বারা সাম্রাজ্যবাদী অভীষ্ট পূর্ণ করতে তিনি ব্যগ্র হয়ে ওঠেন এবং লর্ড কার্জনের ঘোষণায় তা ফলপ্রসূ হয়। এই বিভাজনের বিরুদ্ধে বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবীদের তীব্র প্রতিবাদ গর্জে ওঠে। একটি শক্তিশালী জনমত গড়ে ওঠে, যাকে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন বলা হয়।
এই আন্দোলনের অনিবার্য পরিণতিতে স্বদেশি আন্দোলনের প্রবল ঢেউ উত্থিত হয়, যার মূল অভিমুখ ছিল ব্রিটিশ পণ্য বর্জন এবং দেশীয় শিল্পে আগ্রহ তৈরি। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হল, বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলস, জাতীয় শিক্ষা পরিষদ, স্বদেশি ভাণ্ডার, বেঙ্গল কেমিক্যালস্ অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস প্রভৃতি। অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মের সঙ্গেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রটিও উত্তাল হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে-বাইরে উপন্যাসটি ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব, নৈতিকতা বনাম উগ্র জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব এবং নারী স্বাধীনতার প্রশ্নকে গভীরভাবে উপস্থাপন করে। দেশপ্রেমের তুল্যমূল্য বিচারের ঘটনা এখানে সুচারুরূপে পরিস্ফুটিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী উপন্যাস ‘ঘরে-বাইরে’ (১৯১৬) জাতীয় সংকটের প্রেক্ষিতে মানবিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের গভীর বিশ্লেষণ। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও তা থেকে উদ্ভূত স্বদেশি আন্দোলন উপন্যাসটির মূল পটভূমি, যা লেখকের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে প্রতিবিম্বিত হয়েছে।
নিখিলেশ, বিমলা ও সন্দীপ, ঘরে-বাইরে উপন্যাসের এ তিনটি মুখ্য চরিত্র বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার প্রতীক ছিল। নিখিলেশ ছিলেন একজন শিক্ষিত, মানবতাবাদী জমিদার। তিনি রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হলেও বিশ্বাস করেন, জাতীয়তাবাদ যদি নৈতিকতা ও সহানুভূতির ভিত্তিতে না গড়ে ওঠে, তবে তা হিংসাত্মক ও আত্মবিধ্বংসী হতে পারে। তিনি সন্দীপের উগ্র রাজনীতির বিরোধিতা করেন এবং বিমলার স্বাধীনতাকে সমর্থন দিলেও তাঁকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে ছদ্ম দেশপ্রেমিক সন্দীপের চরিত্রে স্বদেশি আন্দোলনের উগ্র ও আত্মকেন্দ্রিক দিকটি পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। তিনি জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করলেও প্রকৃতপক্ষে নিজস্ব ক্ষমতা ও লোভ চরিতার্থ করতে চান। তাঁর জন্য দেশপ্রেম একটি আবেগময় আবরণ মাত্র, যার আড়ালে তিনি সমাজে বিভাজন ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন।
এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রের নাম বিমলা। শিক্ষিতা বিমলা ঘরের নারীত্ব থেকে বাইরের রাজনৈতিক জগতে প্রবেশ করেন। সন্দীপের কথার জাদু তাঁর মনকে আকৃষ্ট করে। তিনি দেশসেবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ঘরের বাইরে পা রাখেন। দেশসেবার আদর্শে নিজেকে মেলে ধরেন। কিন্তু বিভিন্ন ঘটনার অভিঘাতে তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁকে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে। সন্দীপের দেশভক্তি যে কপট ছিল, তা অনুধাবন করতে একটু সময় লাগলেও পরিশেষে বিমলার কাছে ধরা পড়ে যায়। এই উপলব্ধি বিমলার আত্মচেতনার জাগরণ এবং উপন্যাসের নৈতিক শিক্ষা।
রবীন্দ্রনাথ এখানে কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনের স্তুতি করেননি, বরং তার ফলশ্রুতিতে সমাজ ও ব্যক্তিমানসে যে জটিলতা তৈরি হয়, সেটিই তুলে ধরেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি যদি আত্মবোধ, মানবতা ও নৈতিকতার বাইরে চলে যায়, তবে তা ব্যক্তিকে যেমন ভ্রান্ত করে, তেমন সমাজকেও বিভ্রান্ত করে তোলে। ঘরে-বাইরে কেবল বঙ্গভঙ্গ বা স্বদেশি আন্দোলনের সাহিত্যিক দলিল নয়, এটি মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এক দার্শনিক উপন্যাস। এখানে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও তার প্রভাব রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে বিশ্লেষিত হয়েছে, যেখানে দেশপ্রেমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আত্মানুসন্ধান, নৈতিকতা এবং নারীর আত্মবিকাশ। ফলে উপন্যাসটি রাজনৈতিক আন্দোলনের চিত্রায়ন ছাড়াও এক গভীর মানবিক দলিল হয়ে উঠেছে।
ঘরে-বাইরে উপন্যাসে সন্দীপ চরিত্রটি ছদ্ম দেশপ্রেমের একটি প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ এই চরিত্রের মাধ্যমে এমন এক শ্রেণির নেতার চিত্র এঁকেছেন, যাঁরা দেশপ্রেমের মুখোশ পরে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করেন। সন্দীপ উচ্চকণ্ঠে স্বদেশি ও দেশপ্রেমের কথা বলেন, ইংরেজ পণ্যের বর্জন ও স্বদেশি আন্দোলনের নামে জনতার আবেগকে উসকে দেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে যুক্তি বা সহিষ্ণুতা নেই, আছে হিংসা, উগ্রতা ও উসকানি। সন্দীপের ভাষা আবেগপ্রবণ ও মোহজাল বিস্তারকারী। তিনি মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে তাদের মন জয় করেন। বিমলার মনেও তিনি দেশপ্রেমের নামে প্রলোভন তৈরি করেন। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য নিখাদ দেশপ্রেম নয়, বরং ব্যক্তিগত প্রভাব, ক্ষমতা ও বিলাসিতার পিছনে লুকিয়ে থাকা এক স্বার্থপরতা। তিনি নিজের স্বার্থে মিথ্যা বলেন, চুরি করেন, অন্যকে বিভ্রান্ত করেন। তিনি নিখিলেশের অতিথি হয়ে তাঁর স্ত্রী বিমলার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তিনি সম্পর্কের সুযোগ নিতে চান। এতে বোঝা যায়, তাঁর নৈতিকতা নিতান্তই ভঙ্গুর।
রবীন্দ্রনাথ সন্দীপের বিপরীতে নিখিলেশ চরিত্রে প্রকৃত দেশপ্রেম ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। সন্দীপ দেশের জন্য কিছু করার চেয়ে নিজের ‘নাম’, ‘প্রভাব’ ও ‘উচ্চ আসন’ চান। তাঁর দেশপ্রেম কেবল মুখে, কাজে নয়। সন্দীপ নামক চরিত্র সৃজন করে রবীন্দ্রনাথ দেখান যে, দেশপ্রেম যদি আত্মসংযম, নৈতিকতা ও সহানুভূতির ভিত্তিতে না হয়, তবে তা ধ্বংসাত্মক হতে পারে। সন্দীপের মতো নেতা সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ান এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে জাতীয় আবেগকে ব্যবহার করেন। ফলে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে সন্দীপ এক বিপজ্জনক প্রলোভনের নাম। আর নিখিলেশ জমিদার হয়েও প্রজাবৎসল, উগ্রতা বিরোধী। তিনি মুসলিম প্রজাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও ন্যায়পরায়ণ। তিনি চান, হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে বাস করুক। তিনি মুসলিমদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে সম্মান করেন। তিনি তাঁর প্রাসাদে মুসলিম কর্মচারী রাখেন এবং তাঁদের সঙ্গে একইরকম আচরণ করেন। মুসলিমদের অবজ্ঞা করলে স্বাধীনতা আন্দোলন প্রকৃত অর্থে গণ-আন্দোলন হবে না, এই বোধ সন্দীপের ছিল।
ঘরে-বাইরে উপন্যাসে মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘অপর’ হিসাবে দেখানো হয়নি, বরং তাদের সমাজের অপরিহার্য অংশ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সন্দীপের মতো উগ্র ও ছদ্মদেশপ্রেমীদের কারণে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের যে আশঙ্কা, রবীন্দ্রনাথ সেটির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহনশীলতার মাধ্যমে একটি মানবিক ও সমন্বিত জাতীয়তাবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে-বাইরে উপন্যাসে নিখিলেশ ও সন্দীপ— এই দু’টি চরিত্র দেশভক্তির দুই বিপরীত মেরুর প্রতিনিধিত্ব করে। একজন নৈতিকতা, যুক্তি ও মানবতার ভিত্তিতে দেশকে ভালোবাসেন, অন্যজন আবেগ, উগ্রতা ও স্বার্থের মোহে দেশপ্রেমকে ব্যবহার করেন। নিখিলেশের দেশপ্রেম মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও সহনশীলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশকে ভালোবাসা মানে মানুষকে ভালোবাসা, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিনি ভালোবাসাকে সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক মনে করতেন। সন্দীপ নীতির চেয়ে উপলক্ষকে বড় করে দেখেন। তিনি মনে করেন, উদ্দেশ্যসিদ্ধির পথ যেমনই হোক, তাতে ক্ষতি নেই। এজন্য তিনি মিথ্যা, চুরি, চক্রান্ত ও প্রতারণা করতেও দ্বিধা করেন না।
রবীন্দ্রনাথ সন্দীপের দেশপ্রেমকে ‘ছদ্ম দেশভক্তি’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, যা বাস্তবিক অর্থে আত্মমোহ ও বিভাজনের বাহক। অন্যদিকে নিখিলেশের দেশভক্তি আদর্শবাদী, মানবিক ও সুস্থ, সামাজিকবোধসম্পন্ন। এ দুই চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, প্রকৃত দেশপ্রেম হিংসা নয়, হৃদয়ের বিশুদ্ধতা ও মানবতার ওপর দাঁড়িয়ে। জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সন্দীপ নয়, নিখিলেশই যে প্রকৃত দেশপ্রেমিক ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সুন্দরভাবে তা চিত্রিত করেছেন। আর বিমলার মতো সুস্থ মানসিকতার চরিত্র কীভাবে নিখিলেশদের লালসার সামনে পড়তেন, তাও এই উপন্যাসে মূর্ত হয়ে উঠেছে। উপন্যাসটি পাঠ করার পর পাঠক অতি সহজেই প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও কপট দেশপ্রেমিক চরিত্রের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারবেন।
