সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

কিশোর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকরা কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। জোড়াসাঁকোর বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে তিনি যেন বেমানান। যদিও তাঁর প্রতিভার সাক্ষর তিনি রেখেছেন ইতিমধ্যেই, কিন্তু প্রথাগত শিক্ষা না হলে যে কোনওদিকেই সুবিধা হবে না। তাই অবশেষে স্থির হল, তাঁকে বিলেতে পাঠানো হবে। আর এখানেই রচিত হল তাঁর জীবনের এক কম আলোচিত অধ্যায়।
মেজোদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম ভারতীয় আইসিএস। অত্যন্ত রাশভারী মানুষ। চলনেবলনে পুরোদস্তুর সাহেব। তিনি তখন আমেদাবাদে। রবিকে ইংল্যান্ডে থাকতে গেলে তো ইংরেজিতে কথা বলা ও আদবকায়দা রপ্ত করতে হবে। রবি প্রথমে গেলেন আমেদাবাদে। তারপর সেখান থেকে গেলেন মুম্বই শহরে মেজোদাদা সত্যেন্দ্রনাথের বন্ধু ড. আত্মারাম পাণ্ডুরঙের বাড়িতে। সেখানেই দেখা পেলেন তাঁর থেকে তিন বছরের বড়ো পাণ্ডুরঙের কন্যার। মেয়েটির নাম অন্নপূর্ণা তড়খড়, আনা।
আনা সবে বিলেত থেকে ফিরেছেন। তিনি সুন্দরী তরুণী। তাঁদের পরিবার যথেষ্ট শিক্ষিত। তাঁর বাবা আত্মারাম প্রার্থনা সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। আত্মারামের ভাইও বেশ শিক্ষিত। পাণ্ডুরঙ দাদোবা তড়খড় বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী। সংস্কৃতিসম্পন্ন পরিবারের মেয়ে হওয়ার সুবাদে আনা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন একেবারে অন্য ধরনের।
রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ১৭ বছর। বসন্তের পূর্ণিমায় দেখা হয়েছিল দু’জনের। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সদ্য লেখা বাংলা কবিতার ইংরেজি তর্জমা শোনাতেন আনাকে। প্রথম দেখার মুগ্ধতা ধীরে ধীরে এক গভীর ভালোবাসার দিকে এগিয়ে গেল। তখন রবি লিখে চলেছেন গান, কবিতা আর গদ্য। তাঁর নিষ্পাপ মুখ, উদ্ভাসিত দুই চোখ, রাজকীয় ব্যক্তিত্ব আনাকে বিহ্বল করে তুলেছিল।
আনা বিলেতে থাকার সময় হ্যারল্ড নামে এক ইংরেজের সঙ্গে মন দেওয়া-নেওয়ার পালা শেষ করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল এক জাদুকরি মায়া। আনা নিজেকে সমর্পণ করতে চাইলেও রবি ছিলেন খুব লাজুক। তিনি সে অভিলাষ বুঝতে পারেননি। সে রাত, সে পূর্ণিমা আর সে বয়স, সব মিলিয়ে এক আশ্চর্য মাদকতা ছিল।
রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন আনার কাছে একটু আদবকায়দা শিখবেন বলে। তিনি ইংরেজি বলায় তত তুখোড় ছিলেন না। অথচ তার ক’দিন পরেই তাঁকে বিলেত যেতে হবে। তাই এ আয়োজন। ইতিমধ্যে কেটেছে অনেক ক্লান্ত মধ্যাহ্ণ, বৃষ্টিমুখরিত সন্ধ্যা, স্নিগ্ধ সকাল। কিন্তু সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের তরফ থেকে একটা প্রবল দৃঢ়তার কারণে সে ভালো লাগা সম্পূর্ণ প্রেমে পরিণতি পায়নি। সম্পূর্ণ প্লেটোনিক লাভ ছিল। কৃষ্ণ কৃপালনী তাঁর ‘Tagore: a Life’ গ্রন্থে লিখেছেন সে কথা।
অবশ্য আনা রবিকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন, কারণ সেটা তাঁর পক্ষ থেকে হত হ্যারল্ডের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাম দিয়েছিলেন নলিনী। ‘শুনো নলিনী, খোলো গো আঁখি।/ ঘুম এখনো ভাঙিল না কি?’ এ কবিতা তাঁকে উদ্দেশ করেই লেখা।
রবীন্দ্রনাথ মাত্র দু’মাস সেখানে কাটিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই তিনি ইংল্যান্ডের উদ্দেশে পাড়ি দেন। তার দু’বছর পর আনা হ্যারল্ড লিটলডেলকে বিয়ে করেছিলেন। হ্যারল্ড তখন বরোদা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি ছিলেন স্কটিশ। তারপর তাঁরা ইংল্যান্ড চলে যান এবং এডিনবার্গে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
আনার বাবা ইচ্ছুক ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর কন্যার বিয়ে দিতে। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথের আপত্তি ছিল। ছেলের তখনও বিয়ের বয়স হয়নি বলে তাঁর মনে হয়েছিল। তাছাড়া আনার বয়স রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বেশি ছিল। ১৮৭৯ সালের গোড়ায় আত্মারাম কলকাতায় এসেছিলেন সে উদ্দেশ্যে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে দেখাও করেছিলেন।
আনা নিজের সাহিত্যিক ছদ্মনাম রেখেছিলেন নলিনী এবং তাঁর এক ভাইপোর নাম রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কাজেই সেটা নিছক একটা ফ্লার্টেশন ছিল না। রবীন্দ্রনাথও যথেষ্ট আন্তরিক নলিনী নামটি ব্যবহার করতেন। রবীন্দ্রনাথ বৃদ্ধ বয়সে লিখেছিলেন, নলিনী তাঁকে বলেছিলেন, তিনি যেন তাঁর সুন্দর মুখ দাড়ি দিয়ে না ঢাকেন। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে মারা যান আনা।

জানা থাকলেও আবার পড়ে ভালো লাগলো। গানের প্রেক্ষাপটটি জীবনস্মৃতির বর্ণনায় পাওয়া যায়।