Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

এক্তেশ্বরের ঐতিহ্যবাহী গাজন মেলা

এক্তেশ্বরের গাজন মেলা। বাঁকুড়া। ছবি: লেখক।

Share Links:

শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায় 

১৪৩১ বঙ্গাব্দ শেষ হতে চলল। চৈত্রের শেষ মানেই বাংলাজুড়ে শুরু  ঐতিহ্য ও পরম্পরা মেনে  শিবের গাজন। এক্তেশ্বর বাঁকুড়া জেলার একটি উল্লেখযোগ্য পবিত্র শৈবধাম।  এখানেও প্রতিবছর চৈত্রের ১৫ তারিখ থেকে গাজনের ঢাক বাজতে শুরু করে। এ বছরও ইতিমধ্যে ঢাকে কাঠি পড়ে গিয়েছে। এ সময় জাতপাত ভেদাভেদ, সামাজিক কৌলিন্য ভুলে সকল বাঙালি শিব ভজনায় মেতে ওঠে। কংক্রিটের যুগেও পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামে আজও টিকে আছে গাজনতলা। আজও সে সব জায়গায় অনুষ্ঠিত হয় গাজন উৎসব। তবে আগামিদিনে গাজনতলা থাকবে কি না, তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহ রয়েছে। এক্তেশ্বর মন্দিরের কোনও গাজনতলা নেই। লোকের পড়ে থাকা অব্যবহৃত ফাঁকা মাঠেই মেলা বসে। ফাঁকা মাঠগুলিও হয়তো আগামিদিনে থাকবে না।

পুরাণে কোথাও শিবের কোনও গাজনের উল্লেখ না থাকলেও বাংলার মঙ্গলকাব্যে রয়েছে। ধর্মমঙ্গল কাব্যে রয়েছে, রানি রঞ্জাবতী ধর্মকে তুষ্ট করার জন্য গাজন উৎসব চালু করেন। ‘শিবের আজ বড় রঙ্গ/ পিঙ্গল জটার মাঝে গঙ্গার তরঙ্গ।’  গাজন নিয়ে এরকম লোকসংগীত আজও শোনেন বহু মানুষ। আবার গাজন সৃষ্টিতে উত্তরবঙ্গের বাণ রাজার কথাও উঠে আসে।  তিনি ছিলেন শিবের ভক্ত। বাণ রাজার নামেই বানফোঁড়া শব্দটির উদ্ভব বলেও অনেকের মত।

চৈত্রের শেষ মানেই বছরের বার্ধক্য ও নতুন বছর আগমনের ইঙ্গিত। আর ঠিক এ মুহূর্তে বাংলায় ঐতিহ্যবাহী তাৎপর্যময় লোকসংস্কৃতির পরম্পরা গাজন উৎসব বাঙালির কাছে এক আত্মসুখ। গাজনে পুরাণের ধ্যানগম্ভীর শিবকে পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় ভোলাভালা, গাঁজা ও ভাঙ নেশায় পরিপূর্ণ শিবকে। বাঙালির ঐতিহ্য অনুসারে আটপৌরে সম্পর্কে জড়িয়ে রয়েছেন দেবাদিদেব মহাদেব। গাজনের কেন্দ্রবিন্দু তিনিই।

‘গাজন’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, গর্জন থেকে গাজনের উৎপত্তি হয়েছে। গর্জন শব্দের অর্থ সিংহনাদ। গাজন সন্ন্যাসী বা ভক্তাদের গর্জন ও হুঙ্কার থেকে এ শব্দের উৎপত্তি। আবার অনেকেই বলেছেন, ‍‘গ্রামজন’ শব্দটি থেকে গাজন কথাটি উৎপন্ন হয়েছে। চৈত্রের শেষে গাজনের পবিত্র ধুলো পুরো অঙ্গে মেখে বৈশাখের নতুন দিনে পা  রাখার ঐতিহ্য রয়েছে বাঙালিদের। আজও সে পরম্পরা অটুট।

বাংলার গাজন উৎসবের তিনটি প্রথা রয়েছে, ঘাট-সন্ন্যাস, নীলব্রত এবং চড়ক। সাধারণত দুই দেবতাকে কেন্দ্র করে গাজন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। শিব এবং ধর্ম।  কিন্তু দু’টি ক্ষেত্রেই প্রথা মেনে সন্ন্যাস নিতে হয়। গৈরিক বসন পরিধান করতে হয়। যদিও শিবের গাজন ও ধর্মের গাজনের আচরণের মধ্যে বহু  সাদৃশ্য নজরে পড়ে। দু’টি ক্ষেত্রেই সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে একদিন থেকে একমাস অবধি কৃচ্ছ্রতা ও দৈহিক কষ্টের মাধ্যমে গাজনের উৎসব সাঙ্গ করতে হয়।

গাজনের শুরু হয় ঘাট-সন্ন্যাস দিয়ে। চৈত্র সংক্রান্তির তিন দিন আগে শুরু হয়ে যায় ঘাট-সন্ন্যাস।  সন্ন্যাসীদের বলা হয় শিবের ভক্তা। শিবের ভক্তারা গলায় উত্তরীয় পরেন। হাতে বেতের দণ্ড রাখেন।  হবিষ্যি, ফলমূল খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করেন। শিব ছাড়াও লৌকিক দেব-দানবদের পুষ্প প্রদান করেন।  গর্জন করেন, ‍‘হর হর দিগম্বর নাথমুনি মহাদেব’। পাটস্নানের রীতি তো থাকেই।

এক্তেশ্বরে পাটস্নান হয় গাইগোয়ালা পুকুরে। গাইগোয়ালা পুকুর ছাড়াও নিকটস্থ পুকুর, দ বা নদীতে পাটস্নানের পর জলপান করেন এক্তেশ্বরের শিব বা ধর্মের ভক্তারা। বাংলার ঘরে ঘরে মায়েরা সন্তানদের মঙ্গলকামনায় নীলব্রত পালন করেন। এক্তেশ্বরের শিবের থানেও পালিত হয় নীলব্রত। দিনটি বাংলার মায়েদের কাছে পুণ্যকর্মের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। গাজনের দিনের ভোর থেকে শিবের থানে প্রদীপ জ্বেলে ছড়া কেটে পুজো দিয়ে বলা হয়, ‍‘নীলের ঘরে দিয়ে বাতি/ জল খাও গো পুত্রবতী।’  এক্তেশ্বরে প্রদীপ দেওয়া ছাড়াও ভক্তিমতী মহিলারা মাটিতে শয়ন করে বুক বা পিঠে মাটির খোলায় ধুনো পোড়ান। গাইগোয়ালা থেকে মন্দির অবধি দণ্ডি কাটেন। বহু জায়গায় সন্ন্যাসীরা নীলষষ্ঠীর দিনে ঐতিহ্য মেনে ঘরে ঘরে ভিক্ষা করেন। ভিক্ষার অর্থে উদ্‌যাপিত হয় গাজন উৎসব।

এক্তেশ্বরের গাজনে এ ধরনের ভিক্ষার উদ্দেশে বের হওয়ার রীতি নেই। এখানে গাজন হয় সংক্রান্তির আগের দিন।  ঠিক তার আগের দিন ভক্তারা ফললুঠ করেন।

গাজনের একটি অঙ্গ চড়ক। বাংলার বহু স্থানে এখনও চড়ক ও বাণ ফোঁড়া অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে শিবের বহু গাজনে আগুন-সন্ন্যাসী, সঙ সাজা, কালী নাচ, মশাল নাচ,  মুখোশ নাচ দেখা যায়। ‍পতঞ্জলির মহাভাষ্যে হরগৌরী, ভূত-পেত্নি সেজে মুখোশ নৃত্যের উল্লেখ রয়েছে। এক্তেশ্বর গাজনে বাণ ফোঁড়া ও চড়ক হয় না। একসময় এখানে নীলপুজোও বন্ধ ছিল। দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় সিকান্দার শাহ (১৪৮৯-১৫১৭) হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ওপর অত্যাচার করতেন। তার প্রভাব পড়ে এক্তেশ্বর মন্দিরেও। ফলে এক্তেশ্বরে সে সময় নীলপুজো বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে দিল্লির মোঘল সম্রাটের অনুমতি নিয়ে মল্লরাজা বীর হাম্বির মল্ল (১৫৯১-১৬১৬) ও দুর্জন মল্ল (১৬৮২-১৭০২) মন্দিরটির সংস্কার করে নীলপুজো ও গাজন মেলা শুরু করেন।

পশ্চিমবঙ্গে গাজনে কোথাও কোথাও গম্ভীরা গান, যাত্রাপালা, বাউল সংগীতের আসর বসে। এক্তেশ্বর গাজনে যাত্রাপালা, গম্ভীরা গান না হলেও বাউল গানের আসর বসে। মেলা বসে। মেলায় কৃষি সরঞ্জাম থেকে সংসারের প্রয়োজনীয় সমস্ত দ্রব্য, খেলনা, বাঁশের তৈরি আসবাবপত্র নিয়ে দোকানদাররা হাজির হন। এক্তেশ্বর  গাজনের মূল বাদ্য ঢাক।  অন্যান্য বাজনাও বাজে। গাজন একাত্মতা, পরম্পরা, ঐতিহ্যপূর্ণ ধর্মভাবনার উৎসব।

কে কখন প্রথম গাজন উৎসব চালু করেন, তা ইতিহাসে লেখা না থাকলেও পণ্ডিতদের অনুমান,  বৌদ্ধ, হিন্দু, জৈন প্রভৃতি ধর্মের প্রভাব মিলেমিশে সূচনা হয়েছে গাজনের।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए