কাজল মুখার্জি

চিকিৎসা কেবল একটি পেশা নয়, এ এক উচ্চতম মানবধর্ম। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে যিনি এ ধর্ম পালনে নিয়োজিত থেকেছেন, নিঃস্বার্থ সেবাকে জীবনের ব্রত করেছেন, তিনি ডা. তপনকুমার লাহড়ী। চিকিৎসার আড়ালে তিনি গড়ে তুলেছেন এক নীরব বিপ্লব। সংযম, ত্যাগ আর মানুষের প্রতি নিরন্তর ভালোবাসার বিপ্লব।
তপনকুমার লাহিড়ীর জন্ম ১৯৪১ সালের ৩ জানুয়ারি, কলকাতায় এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে। শৈশব থেকেই শৃঙ্খলা ও অনুশাসনের বাতাবরণে বড় হয়ে ওঠেন। ডাক্তারি পড়ার প্রবল আগ্রহ নিয়ে ভর্তি হন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। সেখান থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডে যান উচ্চশিক্ষার জন্য। সেখানে রয়েল কলেজ অব সার্জনস থেকে FRCS (কার্ডিয়াক সার্জারি) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং M.Ch. (Thoracic Surgery) পাশ করে দেশে ফেরেন, যখন অনেকেই বিদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন।
১৯৭৪ সালে ডা. তপনকুমারের কর্মজীবনের মূল অধ্যায় শুরু হয় বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে (BHU)। ধীরে ধীরে থোরাসিক ও কার্ডিয়াক সার্জারির প্রধান হয়ে ওঠেন, কিন্তু পদ-পদবি কখনও তাঁর জীবনদর্শনের কেন্দ্রে ছিল না। তিনি বারবার বলেন, ‘আমি কোনও দিন বড় একজন ডাক্তার হতে চাইনি, শুধু মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম।’ ১৯৯৪ সালের পর থেকে তিনি নিজের মাসিক বেতন ও সম্মাননার অর্থ BHU-র আর্থিকভাবে দুর্বল রোগীদের চিকিৎসার জন্য দান করতে শুরু করেন। অবসর নেন ২০০৩ সালে। কিন্তু তারপরও বিনা পারিশ্রমিকে রোগীদের সেবা করে যাচ্ছেন। তাঁর কোনও গাড়ি নেই, মোবাইল ফোন নেই। বিলাসবহুল জীবন থেকে বহু দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। প্রতিদিন ছাতা হাতে হাসপাতাল অভিমুখে হেঁটে যেতেন। একজন মহান যোগীর মতো জীবনযাপন করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, চিকিৎসকের মূল লক্ষ্য রোগীর প্রতি দায়বদ্ধতা।
প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেও OPD-তে সময়মতো এসে বসতে হবে, এ তাঁর অটল নিয়ম। ক্ষমতার কাছে নতিস্বীকার করা তাঁর অভিধানে ছিল না। আমেরিকার একাধিক বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রস্তাব পেয়েও তিনি তা ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘দেশের দরিদ্র মানুষের জন্যই আমার এ দেশে থাকা দরকার।’ ২০১৬ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মান দিয়েছে। কিন্তু তাঁর কোনও পরিবর্তন হয়নি। মাটির মানুষ থেকে কখনও উপরে ওঠেননি, বরং আরও বেশি করে মানুষের ভিড়ে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।
তপনবাবু বিয়ে করেননি। আপন করে নিয়েছিলেন রোগী ও সহকর্মীদের এবং BHU-র পরিসরকে। ছাত্রদের কাছে তিনি আদর্শ গুরু, সহকর্মীদের কাছে আদর্শ সহকর্মী আর সাধারণ মানুষের চোখে তিনি ঈশ্বরতুল্য চিকিৎসক।
বর্তমানে চিকিৎসা একটি পণ্যে পরিণত হলেও ডা. তপনকুমার লাহিড়ীর মতো মানবসেবা প্রদানকারী জীবন্ত কিংবদন্তিও রয়েছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, একজন মানুষ কেবল নিজের জন্য বাঁচে না, মানুষের জন্য বাঁচাটাই প্রকৃত অর্থে জীবনের শ্রেষ্ঠ সাধনা। তাঁর কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, শুধু চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া নয়, মনুষ্যত্বই একজন প্রকৃত চিকিৎসকের প্রথম শপথ। ঈশ্বরতুল্য এ চিকিৎসককে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা।

Salute to Dr. Lihiri (According to the informations given in this article)