সাগরময় অধিকারী
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প চার বছর পর দ্বিতীয়বারের জন্য হোয়াইট হাউসে ফিরে এলেন। প্রথমবার তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সময় ছিল ২০১৬-২০২০ সাল। পরাজয়ের চার বছর পর আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়াটা নিঃসন্দেহে এক চমকপ্রদ ঘটনা।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ছিলেন ট্রাম্প। একজন মহিলা ছিলেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াইয়ে। তিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী অশ্বেতাঙ্গ কমলা হ্যারিস। ২০২০-র নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে পরাজয়ের চার বছর পর কমলা হ্যারিসকে হারিয়ে ৫ নভেম্বরের ভোটে এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হল ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনকে ইতিহাসের সেরা প্রত্যাবর্তন বলা যাবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বহু চমকপ্রদ প্রত্যাবর্তনের ইতিবৃত্ত রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত হয়েও চার বছরের ব্যবধানে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়াটা চমকপ্রদ ঘটনা হলেও ১৪০ বছর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ট্রাম্প দ্বিতীয়। গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড প্রথম প্রেসিডেন্ট হন ১৮৮৪ সালে। তিনি ছিলেন একজন ডেমোক্র্যাট এবং ট্রাম্পের মতোই নিউইয়র্কের বাসিন্দা। ১৮৮৮-র ভোটে ক্লিভল্যান্ড পরাজিত হন বেঞ্জামিন হ্যারিসনের কাছে। ১৮৯২-তে পরের নির্বাচনে গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড হারিয়ে দেন বেঞ্জামিন হ্যারিসনকে।
ট্রাম্প আমেরিকাকে কীভাবে ফের নিরাপদ, শক্তিশালী, সমৃদ্ধ, বলিষ্ঠ ও অবাধ দেশ হিসাবে গড়ে তুলবেন, তা নির্ভর করবে দেশ ও দেশের বাইরে আমেরিকান নীতি কতখানি বদলাবে, তার ওপর। নির্বাচন প্রচারপর্বে ট্রাম্প ভারত সম্পর্কে এমন অনেক মন্তব্য করেছেন, যা থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, তাঁর দ্বিতীয় কার্যকাল ভারত ও তার অধিবাসীদের জন্য অনুকূল হবে। অতি সাম্প্রতিক বার্তায় ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকান হিন্দুদের স্বার্থরক্ষায় তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ভালো বোঝাপড়া ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রভাবিত করেছে।
তবে এটাও ঠিক, ভারতের জন্য সুযোগের পাশাপাশি কঠিন চ্যালেঞ্জও আসতে পারে। ইন্দো-প্যাসিফিক নামে পরিচিত বিস্তৃত অঞ্চলটিতে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও আধিপত্য প্রতিহত করার জন্য ভারতকে আমেরিকার প্রয়োজন। আমেরিকার চিন নীতির আলোচ্য বিষয়ে বাণিজ্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চিনা আমদানির ওপর আমেরিকার নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। এ বিষয়ে বাইডেন বা ট্রাম্পের চিন্তাভাবনায় কোনও পার্থক্য নেই। চিন ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান মাথায় রাখলে অনুমান করা যায়, তাঁর কার্যকালে ওয়াশিংটন ও নতুন দিল্লির মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে। বিগত একবছরে হামাস বনাম ইজরায়েলের অঘোষিত যুদ্ধ এবং উভয় পক্ষের দুর্গতি বিশ্বের মানুষ দেখেছে। ইজরায়েল যে গাজা ভূখণ্ডে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে অনেকেই একমত। এখন ট্রাম্প দায়িত্বভার নিয়ে নতুন কী পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, তা বিশেষভাবে দেখার।
অন্য পোস্ট: ধর্ষণ, খুন ও বর্তমান সমাজ
নির্বাচনের আগে নেতারা যা বলেন, তার অনেকটাই তো বাস্তবায়িত হয় না বিভিন্ন কারণে। তাই কী হবে ইউক্রেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ? আমেরিকান বিদেশনীতি দ্রুত খুব বদলানোও সম্ভব নয়। ট্রাম্প ভোটারদের কথা দিয়েছিলেন যে, ক্ষমতায় এলে তিনি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন। খানিকটা তীব্র পুরুষতান্ত্রিকতা আর শ্বেতাঙ্গ প্রভুত্বের মানসিকতা নিয়ে সে দেশের মানুষ ভোট দিয়েছেন ট্রাম্পকে। তবে কী হবে পরবর্তী চার বছরে, তার উত্তর জানাবে সময়।
ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হয়েই প্যারিস পরিবেশ চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন আমেরিকাকে বেশ কিছু ডলার বাঁচানোর উদ্দেশ্যে। এবার ১১-২২ নভেম্বর আজারবাইজানের রাজধানী বাকু-তে ‘সিওপি ২৯’ পরিবেশ সম্মেলনের প্রেক্ষিতে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন কী বার্তা দেয়, তা দেখা যাক।

