কাজল মুখার্জি

রঙের উৎসব দোলযাত্রা এবং হোলি ভারতীয় সংস্কৃতির এক অপূর্ব উপহার। এ দু’টি উৎসব মূলত এক হলেও ধর্ম, আচার ও আঞ্চলিক বৈচিত্রের কারণে কিছু পার্থক্য রয়েছে। দোলযাত্রা প্রধানত বঙ্গ-সহ পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বিশেষভাবে উদ্যাপিত হয়, যেখানে শ্রীচৈতন্যের ভক্তি আন্দোলনের সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে হোলি মূলত উত্তর ও পশ্চিম ভারতে জনপ্রিয়, যা হিন্দু পুরাণে বর্ণিত প্রহ্লাদ ও হিরণ্যকশিপুর কাহিনির সঙ্গে সম্পর্কিত। আজকের সমাজে এ উৎসব শুধু ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সর্বজনীন উদ্যাপনের রূপ নিয়েছে।
দোলযাত্রা মূলত বৈষ্ণব ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মদিন হিসাবে গৌড়ীয় বৈষ্ণবরা একে বিশেষভাবে পালন করে থাকেন। ‘দোল পূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত এ উৎসব মূলত রাধা-কৃষ্ণের দোলযাত্রার প্রতীকী রূপ। পুরাণে বলা হয়, এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে গোপীদের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। পরবর্তীতে শ্রীচৈতন্য এ উৎসবকে ভক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে এক বিশেষ মাত্রা দেন।
হোলির মূল কাহিনি জড়িত বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদের সঙ্গে। পৌরাণিক মতে, অত্যাচারী রাজা হিরণ্যকশিপু চেয়েছিল যে, তাঁর পুত্র প্রহ্লাদ তাঁকে ঈশ্বর হিসাবে পুজো করুন। কিন্তু প্রহ্লাদ ভগবান বিষ্ণুর প্রতি অনুগত ছিলেন। রাজার বোন হোলিকা, যাঁকে অগ্নিতে না পোড়ার বর দেওয়া হয়েছিল, তিনি প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করে তাঁকে মারার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ বেঁচে যান, আর হোলিকা পুড়ে যান। ওই ঘটনাকে স্মরণ করে ‘হোলিকা দহন’ পালিত হয়। তার পরের দিন রং খেলার মাধ্যমে আনন্দ উদ্যাপন করা হয়, যা ‘হোলি রঙ্গোলি’ নামে পরিচিত।
ভক্তির প্রতীক: দোলযাত্রা মূলত শ্রীচৈতন্যের ভক্তি আন্দোলনের প্রতিফলন, যা মানুষের মধ্যে প্রেম, সহানুভূতি ও ভক্তির বোধ জাগ্রত করে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ন্যায়বোধ: হোলির মূল শিক্ষাই হল, অত্যাচারী ও অসৎ শক্তির পরাজয় এবং ধর্মের জয়।
বসন্তের বার্তা: দোল ও হোলি বসন্ত ঋতুর আগমনের প্রতীক। কৃষিনির্ভর সমাজে এটি শস্যের নবজাগরণ এবং উর্বরতার উৎসব হিসাবেও দেখা হয়।
সামাজিক বন্ধন: হোলির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি সামাজিক বিভেদ ভুলে এক হওয়ার বার্তা দেয়। জাতি-বর্ণ-লিঙ্গনির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে রং খেলায় মেতে ওঠে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দোল ও হোলির উদ্যাপনেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক সমাজে এ উৎসবের কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, আবার কিছু চ্যালেঞ্জও দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক: দোল ও হোলি আজ ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব উদ্যাপন: অনেক জায়গায় আজকাল প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার বাড়ছে, যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্য উভয়ের পক্ষে উপকারী।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: হোলি আজ শুধু ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এমনকী জাপানেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
জল অপচয়: বিশেষ করে উত্তর ভারতে জলখেলাকে হোলির অন্যতম অংশ হিসাবে ধরা হয়, যা অনেক জায়গায় জলসংকটের পরিস্থিতিতে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
নারী নিরাপত্তা: হোলির দিন কিছু জায়গায় নারী নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে, যেখানে অসভ্য আচরণকে ‘উৎসবের মজা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
কেমিক্যাল রঙের মাধ্যমে ক্ষতি: রাসায়নিক মিশ্রিত রং শুধু ত্বক ও স্বাস্থ্যের নয়, পরিবেশের পক্ষেও ক্ষতিকর হতে পারে।
দোলযাত্রা ও হোলি শুধু রঙের খেলা নয়, এটি ভালো-মন্দের লড়াই, প্রেম-ভক্তির মিলন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগের উৎসব। আধুনিক যুগে এ উৎসবের সঠিক মূল্যায়ন করতে গেলে আমাদের পরিবেশবান্ধব রং ব্যবহার, নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জল অপচয় রোধ করার দিকে নজর দিতে হবে। উৎসব তখনই সার্থক হয়, যখন তা আনন্দের পাশাপাশি সমাজের কল্যাণেও সহায়ক হয়। সুতরাং চলুন, আমরা সবাই মিলে দোল ও হোলিকে সত্যিকারের সম্প্রীতির রঙে রাঙিয়ে তুলি।
