ভাস্কর সেনগুপ্ত

বাবা, মা, ছেলেমেয়ে ট্রেনে করে বেড়াতে যাচ্ছে। বাচ্চা ছেলে এক জায়গায় বসে থাকতে পারে না। একটা বল নিয়ে লোফালুফি করছে। দিদি বলছে, ভাই, ট্রেন চলেছে, বলটা উপরে ছুড়লে হাতে আসবে না, পড়ে যাবে। কিন্ত বলটা হাতেই আসছে। মেয়ে বলল, বাবা, এটা কী করে হচ্ছে? বলটা পড়ছে না কেন? ট্রেন তো এগিয়ে যাচ্ছে। বলটা মাটিতে পড়ার কথা। সদ্য বিজ্ঞান পড়ছে, তাই মনে প্রশ্ন। বাবা স্থিতি-গতি বোঝালেন। ট্রেনের সঙ্গ করছি বলে আমরা ট্রেনের গতিতে চলছি। বলটা ট্রেনের গতিতে চলছে। ট্রেনের ভিতরে যে বাতাস আছে, সেটাও ট্রেনের গতিতে চলছে। এটা association বা সঙ্গের জন্য হচ্ছে। Cold drinks ঢাললে গ্লাস ঠান্ডা হয়। চা ঢাললে কাপ গরম হয়। বিজ্ঞানের এই তত্ত্ব জড়জগতে প্রমাণিত সত্য। আর্য ঋষিরা বলেছেন, শুধু জড়জগৎ নয়, অজড় জগতেও সত্য। সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে নরকবাস। মহাভারতে ব্যাসদেব এই তত্ত্ব ঘটনার মাধ্যমে বুঝিয়েছেন।
সৌভরী মুনি যোগবলে জলের নীচে বসে সাধনা করছিলেন। জলের মধ্যে পুরুষ মাছ ও স্ত্রী মাছের জলকেলি দেখে তাঁর স্ত্রী-সঙ্গ করার বাসনা জাগল। মহারাজের কাছে গেলেন। বললেন, আমি আপনার কন্যাকে বিয়ে করব। রাজা বিচলিত হলেন। এই বৃদ্ধ লোকের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেব কেমন ভাবে! আবার যোগীবরকে না বলতে পারছেন না। যদি ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন, সর্বনাশ হয়ে যাবে! বুদ্ধি করে বললেন, আমার যে মেয়ে রাজি হবে, তার সঙ্গে বিয়ে দেব। ভেবেছিলেন কোনও মেয়েই রাজি হবেন না। মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, যোগীবরকে অন্দর মহলে নিয়ে যাও। মন্ত্রী চলছেন আগে, যোগীবর পিছনে। মন্ত্রী দেখলেন, রাজার কন্যারা সকলেই বিচলিত হয়ে পড়লেন। সকলেই বিয়ে করতে ইচ্ছুক। মন্ত্রী পিছন দিকে তাকিয়ে দেখলেন যোগীবর এক কন্দরপকান্তি যুবকের রূপ ধরেছেন। বুঝলেন যোগীর ক্ষমতা।
বিয়ে হল। দীর্ঘদিন সংসার করলেন যোগীবর। উপলব্ধি করলেন সংসার অসার। ফিরে গেলেন ভগবৎ আরাধনায়। অনুভব হল সামান্য মাছের সঙ্গ করে তার মতিভ্রম হয়েছে। সংযমী যোগীর যদি এমন বুদ্ধিবিভ্রম হয়, তাহলে আমরা কোনওমতেই সুরক্ষিত নই। সুতরাং সাবধান!
শঙ্করাচার্য গিয়েছেন নাগার্জুন প্রদেশে অদ্বৈত মত প্রচারার্থে। গ্রামবাসী বলল, আমরা আপনার মতো বিজ্ঞ নই, বাগ্মীও নই। আমাদের গ্রামের নাগার্জুন শিব যদি নিজ মুখে বলেন, তবে আপনার কথা মানব।
শঙ্করাচার্য পড়লেন মহাবিপদে। ভগবান তাদের সঙ্গে কথা বলবেন, তা কী করে সম্ভব! মন্দিরে প্রবেশ করলেন। ঠাকুরের সামনে বসলেন। প্রথমে স্বরচিত এক স্তবে শিবঠাকুরের বন্দনা করলেন। করজোরে প্রার্থনা করলেন, আমি নিজের ইচ্ছামতো ধর্ম প্রচার করতে আসিনি। ব্যাসদেবের আদেশ পালন করছি। তুমি যদি না চাও, আমি এই মুহূর্তে প্রচার বন্ধ করে ফিরে যাব। আর যদি তুমি চাও, গ্রামবাসীকে জানাও তোমার কথা। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল অদ্ভুত ঘটনা। মন্দিরের শিবলিঙ্গ থেকে এক জ্যোতি ও ধুম্র উদগীরণ হল। সেই জ্যোতিপুঞ্জ থেকে জলদগম্ভীর স্বরে উচ্চারিত হল, অদ্বৈত সত্য, অদ্বৈত সত্য, অদ্বৈত সত্য। গ্রামবাসীর না আছে সাধনা, না আছে সেই তপস্যা। তবু দর্শন পেল শঙ্করাচার্যের সঙ্গগুণে।
কালির দাগ সাদা কাপড়ে স্পষ্ট হয়। কালো কাপড়ে দেখা যায় না। কিন্ত দাগ পড়ে। সাধু-মহাত্মারা কুসঙ্গ-সুসঙ্গ বুঝতে পারেন। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না, কিন্ত সঙ্গ দ্বারা প্রভাবিত হয়।
উপেন্দ্রমোহনজি গিয়েছেন ৪ নং শিমলা স্ট্রিটের বাড়িতে। তখন সেখানে তাঁর আত্মীয়স্বজন থাকতেন। একটি ঘরে ঢুকে তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ওই ঘরে অতীতে একটি খুনের ঘটনা ঘটেছিল।
সুতরাং অসৎ সঙ্গ অবশ্যই পরিহার করা উচিত। সৎ ভাবনা, সৎ গ্রন্থ, সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সৎ সঙ্গের প্রয়োজন। তাতে জীবনে শান্তি বিরাজ করবে। সংসার হবে সুষমামণ্ডিত। ধীর-স্থির হবে জীবন। সমস্যা সব সংসারেই থাকে। সৎ জীবন সে সমস্যা থেকে উত্তীর্ণ হতে সহায়তা করে। ঈশ্বরের সাহচর্য পাওয়া সহজ হয়।
