শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

গ্রামবাংলায় খেজুর গাছ ক্রমশ কমছে। একসময় বাংলার গ্রামে গ্রামে পুকুরপাড়, ফাঁকা মাঠ, বনজঙ্গল, টিলায় টিলায় প্রচুর খেজুর গাছ চোখে পড়ত। রেললাইনের ধারে, রাস্তাঘাটে শোভা দিত খেজুর গাছ। এখন খেজুর গাছ আছে, তবে সংখ্যায় কমে গিয়েছে। খেজুর গাছকে যদি ছোট থেকে সংরক্ষণ করা ও বাঁচিয়ে রাখা না হয়, তবে কয়েক দশক পরে এর সংখ্যা তলানিতে ঠেকে যাবে।
কাঁটাযুক্ত লম্বা পাাতার শাখাবিহীন খেজুর গাছ অত্যন্ত উপকারী। গাছটির বিজ্ঞানসম্মত নাম Phoenix Dactylifera. খেজুর গাছ শুধু সুস্বাদু ফল দেয় না, এটি ঔষধিও। এছাড়া গাছটি থেকে রস, গুড় প্রাপ্তি তো আছেই, এছাড়া খেজুরের বাসি রসে ‘তাড়ি’ নামের একধরনের মদ তৈরি হয়। দেশ-বিদেশে বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রিসর্ট প্রভৃতিতে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য খেজুর গাছ লাগানো হয়।
বাঁকুড়া জেলাজুড়ে এখন প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা তাপমাত্রা থাকছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দুপুরে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকছে। এই ঠান্ডায় জেলাবাসী জবুথবু হয়ে গেলেও মৎস্যজীবী, পানিফল চাষি, খেজুর গাছের রস সংগ্রহকারীরা দিব্যি ঠান্ডাকে গায়ে মেখে কাজ করে চলেছেন। জেলার রাস্তার ধারে ধারে, সুদূর গ্রামের একপাশে, বনের ধারে খেজুর পাতার ছাদন করে অস্থায়ী ছোট্ট কুটির করেছেন শিউলিরা। বাঁকুড়ায় শিউলিদের ‘মহলদার’ বলা হয়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি কোমরে মস্ত দাঁ এবং হাঁড়ি ঝুলিয়ে খেজুর গাছ থেকে রস জোগাড়ের ব্যবস্থা করেন। ভোর হতে না হতেই লম্বা উঁচু গাছ থেকে পেড়ে এনে হাঁড়ির রস বড় টিনের তৈরি পাত্রে ঢালছেন। কাঠ বা পাতার আগুনে ফুটিয়ে তৈরি করছেন গুড়, পাটালি। বাঁকুড়ারয় খোলা বাজারে খেজুর গুড়ের দাম এখন কমবেশি ১০০ টাকা প্রতি কেজি। খেজুর গুড়ের চাহিদাও রয়েছে প্রচুর। পথচলতি গাড়ি থামিয়ে গুড় কিনে নিয়েও যাচ্ছেন বহু মানুষ।
বাঁকুড়া জেলায় গত অগ্রহায়ণের সংক্রান্তি ছিল পিঠে পরবের লৌকিক উৎসব। পুরো অগ্রহায়ণ মাস ধরে পূজিতা ইতুদেবীর বিসর্জন হয় ওইদিন ভোরে। তাই সন্ধ্যায় নতুন ধান থেকে চালের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি পিঠে খাওয়ার রীতি রয়েছে এই জেলায়। পিঠের সঙ্গে খেজুর গুড়ের পিঠাপিঠি সম্পর্ক।স্বাভাবিকভাবেই খেজুর গুড়ের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। ইতুপুজোর পর জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে টুসুপুজো। পৌষসংক্রান্তির ভোরে হয় টুসু ভাসান। সেই উপলক্ষে ঘরে ঘরে তৈরি হয় পুলি পিঠে। বাঁকুড়ার মানুষ পুলি পিঠেকে ‘গেড়গেড়্যা’ পিঠে বলে থাকেন। পৌষসংক্রান্তির পুলি পিঠে উৎসবের আগেভাগে এখন থেকেই খেজুর গুড় কেনা শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই মহলদার বা শিউলিদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। এক মহলদারের বক্তব্য, ‘ঠান্ডা বেশি হলে খেজুরের রস খুব ভালো হয়। রস টক হয়ে যায় না। তা থেকে খুব সুস্বাদু গুড় তৈরি হয়। তবে বৃষ্টি হলে বা হঠাৎ গরম পড়ে গেলে লোকসান হয়ে যায়। মহাজনের টাকা শোধ করতে পারি না।’
