ডা. সতীনাথ ভট্টাচার্য

তাঁরা থাকেন খুব উঁচু পাঁচিলের ওপারে, সমাজের মূলস্রোতের বাইরে। যখন তখন বাইরে বের হতে পারেন না। কখনও যদি বাইরে বেরোনোর সুযোগ আসে, তখন পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যে থেকে বেরোতে হয়। তাঁরা আমাদের চোখে দাগি, কয়েদি। আমরা তাঁদের নিচু চোখে দেখতেই অভ্যস্ত। তাঁরাও যে আমাদের মতোই মানুষ, তাঁদের মধ্যেও যে আছেন অনেক নামী-দামি পেশার মানুষ, মনের কোণে জীবন্ত হয়ে থাকে সংস্কৃতিমনস্ক সুজন, একথা আমরা প্রায়শই ভুলে যাই। যথাযথ পরিচর্যায় তাঁরাও ফিরে আসতে পারেন সমাজের মূলস্রোতে। আর এ কাজে এখন কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছেন খ্যাতনামা নাট্যকার, বিশিষ্ট শিক্ষক তথা মানুষ গড়ার কারিগর সুশান্তকুমার হালদার।
‘আমি যখন গাড়ি চালিয়ে এই উঁচু পাঁচিলের পাশ দিয়ে যেতাম, তখন ভাবতাম, পাঁচিলের ওপারে যাঁরা থাকেন, তাঁরা সবাই কালা আদমি, খারাপ মানুষ। কিন্তু এখন নিজে এই পাঁচিলের ওপারে থেকে বুঝেছি, এঁরাও ভালো মানুষ।’ এভাবেই কাশীপুর রামকৃষ্ণ মঠের অধ্যক্ষ পরম পূজনীয় স্বামী দিব্যানন্দের কাছে নিজের মনের কথা উজাড় করে দেন মেদিনীপুর সংশোধনাগারের আবাসিক একজন নামী চিকিৎসক। স্বামী দিব্যানন্দ যখন এই সংশোধনাগারে এসেছিলেন, তখন সেই চিকিৎসক তাঁকে আরও জানান, একবার তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে সংশোধনাগারের আবাসিকদের অক্লান্ত সেবায় অল্পদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তিনি অকপটে স্বীকার করে নেন, এরকম সেবা কোনওদিন তাঁর মা বা স্ত্রীর কাছ থেকে পাননি। গত ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় কৃষ্ণনগর রবীন্দ্রভবনে নদিয়া জেলা সংশোধনাগারের বন্দিদের অভিনীত নাটক ‘বিপ্লবী সন্ন্যাসী শ্রীঅরবিন্দ’ মঞ্চস্থ হওয়ার আগে একথা জানান স্বামী দিব্যানন্দ মহারাজ। তাঁর পাশে তখন উপস্থিত ছিলেন নদিয়া জেলা সংশোধনাগারের অধিক্ষক উত্তম কুমার, পশ্চিমবঙ্গ সংশোধনাগার প্রশাসন বিভাগের উপসচিব অসীম বিশ্বাস এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস। মঞ্চের একপাশে ছিল স্বামী বিবেকানন্দ ও ঋষি অরবিন্দের পুষ্পমাল্যশোভিত প্রতিকৃতি। তার সামনে প্রজ্বলিত দীপশিখা থেকে যেন স্বর্গীয় দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছিল।
রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ ২০০৩ সাল থেকে সংশোধনাগারের আবাসিকদের মানসিক পরিবর্তন ও বিকাশে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বামী দিব্যানন্দ এ কাজের প্রধান কান্ডারি। মালদহ, মেদিনীপুর, নদিয়া জেলা সংশোধনাগারে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত। এ সব সংশোধনাগারে পড়াশোনা ও সংস্কৃতিচর্চাও হয়। নদিয়া জেলা সংশোধনাগারের মহিলা আবাসিকদের হাতে তৈরি নানারকম সামগ্রী তিনি কাশীপুর উদ্যানবাটিতে কল্পতরু উৎসবে বিক্রির বন্দোবস্ত করেছেন। আর পুরুষ আবাসিকদের তৈরি জামাকাপড় অনাথ আশ্রমে বিলি করেছেন। ওদিন তিনি জানান, বহুবার জেলখাটা এক পকেটমারের আত্মগ্লানি আসে স্বামী বিবেকান্দ ও রবীন্দ্রনাথের বই পড়ে। সে চুরির পথ ছেড়ে দিয়ে এখন মানিকচকে একটি বাগানে মালির কাজ করে সৎ পথে মাসে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা আয় করছে এবং আনন্দে আছে।
উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, ‘নদিয়া জেলা সংশোধনাগারের আবাসিকরা এক লক্ষ ফুটবল তৈরি করেছেন।’
ওইদিন স্বামী দিব্যানন্দের মুখে উচ্চারিত হয় স্বামী বিবেকানন্দের কথা, ‘মানুষকে পাপী বলাই মহাপাপ।’ তিনি জানান, স্বামীজি বলেছেন, গরু গরুই থাকে, দেওয়াল দেওয়ালই থাকে, কেবল মানুষই ভুল করে, আবার তা সংশোধন করে নেয়। স্বামী বিবেকানন্দের কথামতোই অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হয়ে এখন সংশোধনের পথে পা বাড়িয়ে কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত নাট্যদল ‘কৃষ্ণনগর সিঞ্চন’ -এর সুশান্তধারায় সিঞ্চিত হচ্ছেন নদিয়া জেলা সংশোধনাগারের আবাসিকরা। নামকরা নাট্যকার সুশান্তকুমার হালদারের অঙ্গুলিহেলনে ওইদিন তাঁরা মঞ্চস্থ করেন নাটক ‘বিপ্লবী সন্ন্যাসী শ্রীঅরবিন্দ’। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনা সুশান্তকুমার হালদারের এবং প্রযোজনায় ‘কৃষ্ণনগর সিঞ্চন’। যৌথ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্বামী দিব্যানন্দ, নদিয়া জেলা সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ এবং পশ্চিমবঙ্গ সংশোধনী পরিষেবা দফতর। ওইদিনের নাটকটি ছিল সংশোধনাগারের আবাসিকদের তৃতীয় উপস্থাপনা। তাঁদের প্রথম নাটক সুশান্তকুমার হালদারের লেখা ‘মহাবৃত্তে’ এবং দ্বিতীয় রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’। এই দু’টি নাটকের নির্দেশনাও সুশান্তর। ‘মহাবৃত্তে’ কলকাতায় সবলা মেলায় অভিনীত হয়েছে এবং যথেষ্ট প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বন্ধনডোর কি কখনও মুক্তির স্বাদ এনে দিতে পারে? ঋষি অরবিন্দ কারার অন্ধকার কুঠুরির মধ্যে বন্দিদশাতেই পেয়েছিলেন তাঁর পরম আরাধ্য গোবিন্দের দর্শন, মহামুক্তির স্বাদ। ওইদিনের নাটকে ঋষি অরবিন্দের চরিত্রে সমর দাসের অভিনয় দেখে বারবার মনে হচ্ছিল, তিনিও বোধ হয় এই বন্ধন ডোরের মধ্যেই পেয়ে গিয়েছেন আরাধ্যের দর্শন, মুক্তির দিশা। তাঁর সাবলীল অভিনয় মনে করিয়ে দিয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কথা, আসল নকল সব এক হয়ে গিয়েছে। ‘বিপ্লবী সন্ন্যাসী শ্রী অরবিন্দ’ নাটকে প্রতিটি নাট্যকর্মীর অভিনয় প্রশংসার দাবি রাখে। বারীন ঘোষের চরিত্রে সনৎ ঘোষের অভিনয় যে কোনও পেশাদার অভিনেতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। ওইদিন রবীন্দ্রভবনের মঞ্চে সুশান্তকুমার হালদারের হাতের সোনার কাঠির ছোঁয়ায় সংশোধনাগারের আবাসিকদের মধ্যে কেউ হয়ে উঠেছেন বিচারক, কেউ আইনজীবী, আবার কেউ পুলিশ অফিসার। বিপুল চাকি বিচক্রফট হয়ে বসে পড়েছেন বিচারকের আসনে। নর্টনরূপী সাহাদালি শেখ ইংরেজের পক্ষ নিয়ে অরবিন্দ ঘোষের বিপক্ষে আর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশরূপী বিপ্লব বিশ্বাস অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে জোরদার সওয়াল চালিয়ে গিয়েছেন। ক্রেগানের ভূমিকায় গফর শেখের অনবদ্য অভিনয় দর্শকদের মন কেড়ে নিয়েছে। নাটকে ব্যবহৃত ‘বঙ্গ আমার, জননী আমার’ দ্বিজেন্দ্রগীতি কানকে আরাম দিয়েছে। সুশান্তপরশে এখন নদিয়া জেলা সংশোধনাগারের আবাসিকরা মঞ্চ দাপিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে মাথা উঁচু করে জানিয়ে দিচ্ছেন, ‘আমরাও পারি’। নাটক শেষে স্বামী দিব্যানন্দ প্রত্যেক নাট্যকর্মীর হাতে তুলে দিয়েছেন তাঁর আশীর্বাদভরা উপহার।
প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায় কলকাতায় সংশোধনাগারের আবাসিকদের নিয়ে কাজ করে চলেছেন। তাঁর নির্দেশে সংশোধনাগারের আবাসিকরা মঞ্চস্থ করেছেন ‘বাল্মীকি প্রতিভা’, যার শততম মঞ্চায়ন হয়ে গিয়েছে। তাঁর হাত ধরে উঠে এসেছেন নাইজেল আকারা। তিনি এখন সেলুলয়েডে চুটিয়ে অভিনয় করছেন। এভাবেই সুশান্তর হাত ধরে উঠে আসুক সমর, সনৎ, বিপুল, বিপ্লব, গফর, সাহাদালিরা। তাঁরাও একদিন নিশ্চয়ই পা রাখবেন রূপোলি পর্দায়। সে দিনের অপেক্ষায় এখন দিন গুনছি আমরা।

মোহিত হলাম। লেখার বাঁধন মনে এক দৃশ্যপট তৈরি করছে।