সুদীপনারায়ণ ঘোষ

জুনের প্রথম দিকে কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়নি, আরও কিছু হয়েছে। কয়েক দশক ধরে ছায়াযুদ্ধ, কৌশলগত প্রক্সি, সাইবার অনুপ্রবেশ এবং লক্ষ্যবস্তু (টার্গেটেড) ধ্বংসের পর ইজরায়েল ও ইরান এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেটাকে নির্দ্বিধায় যুদ্ধাবস্থা বলা যায়। ১২ জুন থেকে ৫ দিনে ইজরায়েলের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ এবং ইরানের ‘ট্রু প্রমিস ৩’ নামে যে অভিযান চলছে, তা ইতিমধ্যে আঞ্চলিক শৃঙ্খলা ও সম্ভাব্য বিশ্বব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এ নিছক উত্তেজনা নয়, আদর্শগত পরিবর্তন।
বহু বছর ধরে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বছরের পর বছর ইরান, ইজরায়েল, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক এমনকী সাইবার স্পেসেও ঘোর বিপজ্জনক ঠান্ডা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। পারমাণবিক বিজ্ঞানী, ইরানিয়ান রেভোলিউশনারি গার্ড কমান্ডার ও ইজরায়েলি কূটনীতিকদের ওপর হামলা, নাশকতা ও হত্যাকাণ্ড ভবিষ্যৎে দীর্ঘস্থায়ী বৃহত্তর সংঘর্ষের রূপ নেবে। ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত শত্রুতা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।
অভিযানের প্রথম তিন দিনে সারা ইরানে ১৭০টি লক্ষ্যবস্তু এবং ৭২০টিরও বেশি সামরিক পরিকাঠামোয় ইজরায়েল অপ্রত্যাশিত আক্রমণ করেছে। ১,৬০০ কিলোমিটার দূর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার প্রয়োজনীয় লজিস্টিক এবং কৌশলগত দক্ষতা ইজরায়েলের আছে। এই নব নব রণকৌশল-প্রযুক্তি চিন্তার উদ্রেক করে। এটা ঐতিহাসিক, নির্ভুল, আধুনিক যুদ্ধ।
পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন
প্রথমে ইজরায়েলের যুক্তি ছিল ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামো পঙ্গু করে ফেলা। তবে খুব দ্রুত অন্য লক্ষ্য বেরিয়ে পড়েছে। এটা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আটকে নেই। আয়াতুল্লাহ খামেনেইর অপসারণ এবং ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনকে অভিযানের নতুন লক্ষ্য বানানো, নির্দেশিত যুদ্ধাস্ত্র এবং নিধনকারী হামলায় তা প্রকাশিত।
‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’ গণবিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে শুরু হয়ে সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসিতে শেষ হয়েছিল। লিবিয়া ‘নো-ফ্লাই জোন’ থেকে গদ্দাফির গণহত্যার দিকে রূপান্তরিত হয়েছিল। ইরান এখন একই ধরনের চাপে। পারমাণবিক বাংকার আক্রমণ দিয়ে শুরু হয়ে তা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইর শাসনব্যবস্থার অবসানের দিকে চালিত।
ইজরায়েলের কৌশলগত নির্মূলকরণের মতবাদ
ইজরায়েল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয় না। তার লক্ষ্য ভূমি দখল করা বা অবিরাম যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া নয়। এটা ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে। এটা নেতৃত্বকে নির্মূল করে, কমান্ড শৃঙ্খলকে ব্যাহত করে এবং শত্রুর অভিযানের কেন্দ্রস্থলকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে।
সংঘাতের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ২০ জনেরও বেশি সিনিয়র আইআরজিসি কমান্ডার এবং পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কমান্ডার মহম্মদ বাঘেরি এবং ইন্টেল প্রধান গোলাম-রেজা মারহাবিও ছিলেন। এগুলি শুধু নাম নয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, বহু দশকের অভিজ্ঞতা ও কৌশলের সম্পদ। তাঁদের চলে যাওয়ায় ইরান শুধু যুদ্ধে হারছে না, ধারাবাহিকতা, মতবাদ এবং উদ্যোগ হারাচ্ছে।
কৌশলগত পরাজয়
এ যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক দিক ছোট করা যাবে না। ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জ্বালানি পরিকাঠামো ও কমান্ড চেন ধ্বংস করে ইজরায়েল এখন ইরানি জনগণের ওপর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালাচ্ছে। এ হামলাগুলি কেবল সামরিক ও পারমাণবিক পরিকাঠামো ধ্বংস নয়, বরং ভয়, অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি করার জন্য ফলপ্রসূ হয়েছে। ইজরায়েলের আঘাতের এই মানসিক ভয়ে তেহরানের মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
ইরান যথার্থ প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্যর্থ। ইজরায়েল শুধু আকাশসীমায় শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখেনি, এর আখ্যানও নিয়ন্ত্রণ করছে। আদর্শ ও ধারণাগত যুদ্ধও জরুরি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের সমর্থনে ইজরায়েল স্পষ্ট ধারাবাহিকতার সঙ্গে এ বাগযুদ্ধকে প্রাধান্য দেয়।
বিস্তৃত ভূ-কৌশলগত প্রভাব
ইজরায়েল ও ইরানের বাইরে নীরব তৃতীয় পক্ষ আছে, যারা এর পরিণতিগুলি ভোগ করছে, যেমন, চিন। উল্লেখযোগ্য পরিকাঠামো ও জ্বালানি বিনিয়োগের কারণে পশ্চিম এশিয়ায় চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ইরান। ইরানের জ্বালানি নেটওয়ার্ক ও আঞ্চলিক প্রভাব পঙ্গু হলে পরোক্ষভাবে তা চিনের কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর আঘাত হানবে। এ যুদ্ধ আংশিকভাবে পশ্চিম এশিয়ায় চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা। সেটা প্রশংসাযোগ্য। ঠিক যেমন শীতল যুদ্ধে আঞ্চলিক সংঘাতগুলি পরাশক্তির অ্যাজেন্ডা হিসাবে কাজ করেছিল, তেমনই এই নতুন বহুমেরু বিশ্ব অর্থনৈতিক করিডোরগুলিকে যুদ্ধের হাতিয়ার হতে দেখছে।
ইরানের কি পতন হবে?
যুদ্ধ ছ’দিনে চরম মাত্রায় পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছে। ১৯৬৭ সালের ছ’দিনের যুদ্ধের মতো, কিন্তু এবার পারমাণবিক শক্তির চোরাস্রোত রয়েছে। যদি ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন হয়, তাহলে আমরা পশ্চিম এশিয়ার উল্লেখযোগ্য পুনর্গঠনের সাক্ষী হব। এক শান্তিপূর্ণ অঞ্চলের আবির্ভাব হতে পারে, অভিযোগের সমাধানের কারণে নয়, বরং অন্য কোনও রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর ইজরায়েলকে চ্যালেঞ্জ করার উপায় থাকবে না বলে।
তবে আর একটি সম্ভাবনা রয়েছে। নেতানিয়াহু যদি ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে ব্যর্থ হন, সরকার কোনওভাবে টিকে থাকে, তাহলে তেহরান এ সিদ্ধান্তে আসতে পারে যে, ভবিষ্যতের ধ্বংস এড়ানোর একমাত্র উপায় হল, দ্রুত পরমাণু বোমা তৈরি করা। সে ক্ষেত্রে ইজরায়েল ফের প্রতিরোধ করবে, কিন্তু তা অনেক বেশি উত্তেজনা তৈরি করবে।
ইজরায়েল ১৭ বার বিমান হানা দিয়েও ফোর্দোয় ইরানের পারমানবিক শক্তিকেন্দ্রের দ্বার খুলতে পারেনি। সেটি সম্পূর্ণ মাটির তলায় দুই পাহাড়ের নীচে। তার দরজা রয়েছে সংকীর্ণ গিরিপথে। মাটির নীচে আছে একটি ছোটখাটো পারমাণবিক শহর এবং তার দরজা খোলা সহজ নয়। অন্তত ৫০ বার বিমান হানা দিলে এবং একমাত্র আমেরিকা নৌবহরের মিসাইল হামলায় তা সম্ভব। এখানেই সমস্যা। শান্তি আসতে পারে শাসনব্যবস্থার পতন অথবা পারমাণবিক প্রতিরোধের মাধ্যমে। মনে হচ্ছে, এর কোনও মধ্যম পন্থা নেই।
সর্বশেষ খবর হল, ইজরায়েল জানিয়েছে যে, তারা আরাকে ইরানের ভারী জলের চুল্লি এবং নাতাঞ্জের একটি স্থানে আঘাত করেছে, যেটাকে তারা পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত বলে বর্ণনা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, ইজরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নির্মূল করার দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে।
ইজরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেছেন, ইজরায়েলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ত্যাগ করতে ইচ্ছুক আমেরিকান নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিমানের আয়োজন করা হচ্ছে।
এক মানবাধিকার গোষ্ঠীর মতে, ইরানে মৃতের সংখ্যা ৬৩৯ জনের ওপরে পৌঁছেছে। ইজরায়েলে ইরানি হামলার ফলে ২৪ জন মারা গিয়েছে।
কেন ইজরায়েল রেহাই পেতে পারে?
ইজরায়েলের দুঃসাহস অযৌক্তিক নয়। তাদের রয়েছে অতুলনীয় বিমানশক্তি, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (আয়রন ডোম, ডেভিডের স্লিং), পারমাণবিক ক্ষমতা এবং ওয়াশিংটন ও ন্যাটো মিত্রদের অটল সমর্থন। সীমান্তের ভিতরে কিছু ক্ষতি সত্ত্বেও ইজরায়েলি পরিকাঠামো অক্ষত এবং স্থিতিস্থাপক রয়েছে।
বিপরীতে ইরান আজ বিচ্ছিন্ন। ইউক্রেনে নিজস্ব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া রাশিয়ার কোনও ব্যান্ডউইথ নেই। চিন নীরবে তাকিয়ে রয়েছে। আরব বিশ্ব প্রকাশ্যে নিন্দা করলেও ইরানকে দুর্বল দেখে ব্যক্তিগতভাবে স্বস্তি পেয়েছে। আর হিজবুল্লা এবং আসাদ? আঞ্চলিক প্রতিরোধ ক্ষমতা দূর করার জন্য ইজরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে তারা নিরপেক্ষ হয়ে রয়েছে।
আধুনিক যুদ্ধের নতুন মুখ
আমরা দেখছি এক নতুন যুদ্ধ মতবাদের উত্থান, যেখানে সংঘাত সংক্ষিপ্ত, লক্ষ্যবস্তুযুক্ত এবং ব্যবস্থাবিধ্বংসী। যুদ্ধগুলি আর পরিখা এবং সময়সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়, নেতৃত্ব, পরিকাঠামো ও মানসিক স্থিতিস্থাপকতা অক্ষম করার লক্ষ্যে ধাবিত। এটি প্রতিশোধ নয়। কৌশলগত পতন, একটি জাতির যুদ্ধ চালানোর বা নিজেকে শাসন করার ক্ষমতা ভেঙে ফেলা।
বিশ্লেষক এবং ইতিহাসবিদরা ভবিষ্যতে চিন্তা করবেন, ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ শুধু ইরান-ইজরায়েল দ্বন্দ্বে একটি মোড় নয়, এক আঞ্চলিক পরাশক্তি যুদ্ধের নিয়মের পুনর্লিখন। ইরানি জনগণ এমন শাসনব্যবস্থায় আটকে পড়েছে, যা তারা বেছে নেয়নি এবং এমন একটি যুদ্ধ, যা তারা থামাতে পারে না। ফের ভূ-রাজনৈতিক কম্পনের মুখে ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি বিশ্ব উদাসীন।
