শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

ভারতের স্বাধীনতার বয়স ৭৮ বছর। দেশ যখন স্বাধীনতা পেল, অধিকাংশ নদনদীতে সেতু ছিল না। যাতায়াত ছিল কষ্টকর। রাস্তাঘাটে ভয়ংকর ডাকাতদের উপদ্রব ছিল। পালকি, ডুলি, গরুর গাড়ি প্রভৃতি যানবাহন নির্ভর দেশে তখন পায়ে হাঁটাই ছিল যাতায়াতের প্রধান ভরসা। পালকি, গরুর গাড়ি সাধারণ দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রত্যেক ঘরে ছিল না। রাখার সামর্থ্য ছিল না। স্বাধীনতার আগে ও পরে ট্রেন অবশ্য ছিল। তবে তা খুবই কম। গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। হাওড়া থেকে লখনউ পৌঁছতে তিন-চারদিন সময় লেগে যেত। রেললাইন আজকের মতো সুদৃঢ়, উন্নত ও মজবুত ছিল না। ম্যানুয়াল সিগন্যালিং ছিল দেশব্যাপী। প্ল্যাটফর্ম উঁচু ও দীর্ঘ ছিল না। স্টেশনে মাইকের ঘোষণা ছিল না। আজ থেকে ৩০ বছর আগে অনেক জায়গায় ট্রেন আসার ঘণ্টি পড়ত। দেশে স্টিম ইঞ্জিন চলত। বড় শহর-নগর-রাজধানীতে যাওয়ার ট্রেন থাকলেও মফঃস্বলের অধিকাংশ শহরেই তা ছিল না।
ব্রিটিশ ভারতে গ্রামবাংলা ‘অজগাঁ’ স্বীকৃতিতেই ছিল। পল্লিগ্রামের ছায়ার জায়গা ছিল বড় বড় গাছের তলা, খড় ও টিনের আটচালা। ওই ছায়াতেই একসময় আড্ডা জমত। পাটের শন থেকে যোগ চিহ্নাকার চক্র ঘুরিয়ে দড়ি পাকানো হত। বৃদ্ধরা হুঁকোয় টান দিতেন। স্বাধীনতা যখন পাওয়া গেল, তখন দেশে সড়ক, রেল যোগাযোগে অগ্রাধিকার দিতে হল। সড়ক ও রেল যোগাযোগ মানেই দরকার পড়ে নদনদী, খালবিলের উপর সেতুর।
ভারতের নদনদীগুলির চেহারা তখন আজকের মতো শান্ত ছিল না। বর্ষা শুরু হলেই দেশবাসীকে কাঁদিয়ে ছাড়ত। পশ্চিমবঙ্গে দামোদর ও কাঁসাই কত মানুষকে যে ভিটেছাড়া ও ভিখারি করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। ব্রিটিশরা তাদের শাসনকালে বহু নদনদীতে সেতু নির্মাণ করেছিল। কিন্তু তা পর্যাপ্ত ছিল না। ব্যবসার স্বার্থে বড় বড় নগরকে সেতু দিয়ে জুড়েছিল। তবে ব্রিটিশ শাসনের শেষের কয়েক দশক আগে এ সমস্ত নদনদীতে সেতু নির্মিত হয়। ১৯৩৭ সালে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে কালিম্পং, সিকিমের যোগাযোগ যোগাযোগ বাড়াতে তিস্তা ও রঙ্গিত নদীর সঙ্গমে নির্মিত হয় করোনেশন ব্রিজ। তেমনই ১৯৪৩ সালে নির্মিত হয় হাওড়া ব্রিজ, যা ১৯৪৫ সালে উদ্বোধন করা হয়। ২০ বছর পরে ১৯৬৫ সালের ১৪ জুন তার ‘রবীন্দ্র সেতু’ নামকরণ করা হয়।
দেশ যখন স্বাধীনতা পেল, তখন বহু নামকরা নদনদীতে সেতু ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গার উপর ফরাক্কা সেতু, দুর্গাপুরের কাছে দুর্গাপুর ব্রিজ, আরামবাগ সেতু, বর্ধমানের কৃষক সেতু, বীরভূমের ময়ূরাক্ষী সেতু, মুকুটমণিপুরে কাঁসাই ও কুমারী সেতু, এসব ছিল না। সেতু না থাকার কারণে কোনও যানবাহন ৩০ কিলোমিটার পথ যেতে পারত না। নদীতীরে যাত্রা শেষ করতে হত। বর্ষার দিনে যানবাহন নদী পেরিয়ে যেতে পারত না।
ভারত নদীমাতৃক দেশ। গঙ্গা দীর্ঘতম নদী। ১০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের বেশি গাঙ্গেয় উপত্যকা তৈরি করেছে এই নদী। এই গঙ্গাতেও সর্বত্র সেতু গড়ে দিয়ে যায়নি ব্রিটিশ সরকার। দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী, পেন্নার, সবরমতী, নেত্রবতী, ভরতপূজা, পেরিয়ার, পাম্বা, মহানদী, নর্মদা, তাপ্তি, সুবর্ণরেখা, রূপনারায়ণ, এরকম বহু নদনদীতে সেতু নির্মাণ করতে হয়েছে ভারত সরকারকে।
আজকের ভারতে বহু সেতু নির্মিত হয়েছে। যাতায়াত অনেক সুগম হয়েছে। তবু আজও বহু নদনদীতে সেতুর প্রয়োজন আছে। এখনও দেশে নদনদীর পাশে বসবাস করা প্রান্তিক মানুষকে নড়বড়ে বাঁশের সেতুর উপর দিয়ে পেরিয়ে শহরে যেতে হয়। আজও স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ৭৮ বছর পরে নদনদীতে বন্যা এলে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়। নদনদীতে ব্রিজ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেল ব্রিজ বা সাঁতরে নদী পার হয়ে মানুষকে ঘরে পৌঁছতে হয়।
আটের দশকে হাওড়া ব্রিজ বা রবীন্দ্র সেতুতে যানবাহনের চাপ খুবই বাড়ে। সে চাপ থেকে রবীন্দ্র সেতুকে মুক্তি দিতে ১৯৯২ সালের ১০ অক্টোবর চালু হয় বিদ্যাসাগর সেতু। তাতে রবীন্দ্র সেতুর ওপর চাপ অনেকটা কমে। কিন্তু দুর্গাপুর ব্রিজ, বাঁকুড়ার রামানন্দ সেতু, এরকম বহু সেতুর উপর মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের চাপ থাকলেও বিকল্প সেতু নির্মিত হয়নি। ভারতে ইদানীং বড় সমস্যা ফি-বছর নির্বাচন। ভোট কখনও যেন খুচরো, কখনও পাইকারি। বছর বছর নির্বাচন করাতে গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ হয় এই দেশে।
স্বাধীনতার এতগুলি বছর পরে দেখে অবাক হতে হয় যে, আজ আমাদের দেশে এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করার মতো কোনও দল নেই। মারাত্মক ক্ষয় হয়েছে জাতীয় দল কংগ্রেসের। তাই গুটেক টাকা খরচ করে নির্বাচনের পর নির্বাচন করিয়ে কখনও কখনও জোড়াতালি মার্কা কয়েক মাসের সরকার গঠন করতে গিয়ে দেশের আর্থিক সর্বনাশের সম্ভাবনা থেকেই যায়। দেশের নিরাপত্তা খাতে অস্ত্রশস্ত্র, চিকিৎসা খাতে জীবনদায়ী ওষুধ ও সরঞ্জাম কেনায়, মহাকাশ গবেষণায়, নতুন নতুন আবিষ্কারে দেশের টাকা খরচে সাধারণ মানুষের গায়ে লাগে না। কিন্তু কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে দুর্বল ও ক্ষণস্থায়ী সরকার দেশে তৈরি হোক, এমনটা দেশবাসী চায় না।
ব্রিটিশরা ভারতকে স্বাধীনতা নির্বিঘ্নে দিয়ে যায়নি। দাঙ্গা ও বিভাজন উপঢৌকন হিসাবে দিয়ে গিয়েছিল। তবে ভারত সেসব দ্বন্দ্বের দিনকে সামলে নিতে পেরেছিল। স্বাধীনতার পর রাজ্য গঠনের দিকেও ভারতকে নজর দিতে হয়েছিল। ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কয়েকটি রাজ্য গঠন, পুনর্গঠন ও দখল করতে হয়েছে। যেমন, ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিজামের হাত থেকে হায়দরাবাদ রাজ্যের দখল নিতে হয়েছে ভারতকে। তখনও ভারতের সংবিধান অনুমোদিত হয়নি। ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে ভারতের সংবিধান অনুমোদিত হয়। পরের বছর ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান বলবৎ হয়। তারপর ১৯৬০ সালে মহারাষ্ট্র এবং গুজরাত রাজ্য গঠন করা হয়। ১৯৬১ সালে পর্তুগিজদের হাত থেকে গোয়া, দমন ও দিউ-র দখল নেয় ভারত। রাজ্য গঠন ও দখল চলতে থাকে। তার মধ্যেই জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়া, চিনের সঙ্গে যুদ্ধ সামাল দেওয়া, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়লাভ করা চাট্টিখানি বিষয় ছিল না। একদিকে ভাঙাচোরা ভারতের পুনর্গঠন, উন্নয়ন, অন্যদিকে দেশে নকশালি গৃহযুদ্ধ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আগ্রাসী মনোভাবের সঙ্গে লড়াই করা, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি থেকে দেশকে রক্ষা করা ভারতের কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের দেশের মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়, নদনদীর ধারে বসবাস করা মানুষ বর্ষা এলেই নদনদীকে ভয় পায়। আর বহু দূরে নিরাপদে বসবাস করা মানুষ টাকা খরচ করে নদনদী দেখতে যায়। তবে আমাদের দেশ ঠিকমতোই এগিয়ে চলেছে। আজ স্টিম ইঞ্জিন নয়, রেলপথে অতিদ্রুত এগিয়ে চলেছে বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ট্রেন। আগামিদিনে দেশ আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।
