ভাস্কর সেনগুপ্ত

তারিখটা ১৭/0৮/১৯৪৫। ইন্দোনেশিয়া স্বাধীন হল। মিত্রশক্তি স্বাধীনতা দিল। ভারতের জয় হল। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও কথাটা সত্য। ডাচদের থেকে হস্তান্তর হল ক্ষমতা। কিন্তু নিউ গায়না দেওয়া হল না। World Court-এ নালিশ জানাল ইন্দোনেশিয়া। কোর্ট থেকে জানাল, নিউ গায়না যে ইন্দোনেশিয়ার অংশ, তার প্রমাণ দাও। প্রমাণ ইতিহাস নির্ভর হতে হবে। প্রমাণ দিতে হবে সর্বজনগ্রাহ্য কোনও পুস্তক থেকে। কোনও গ্রাম্যগাথা নয়। নির্দিষ্ট দিনে ইন্দোনেশিয়ার উকিল আদালতে হাজির হলেন এক সুবৃহৎ গ্রন্থ নিয়ে। গ্রন্থটি বাল্মীকী রামায়ণ। সুগ্রীব হনুমানদের নির্দেশ দিচ্ছেন কোন কোন দেশে যেতে হবে সীতার অন্বেষণে। আদালত রামায়ণের প্রমাণ গ্রহণ করল। ইন্দোনেশিয়ার জয় হল। যে গ্রন্থকে আমরা কাল্পনিক বলি, যে গ্রন্থের নায়ককে আমরা কাব্যের নায়ক বলি, যে গ্রন্থের প্রাণপুরুষের জন্মস্থান প্রমাণ করতে আমাদের ৭০ বছর সময় লাগে, সেই গ্রন্থ সর্বাধিক প্রামাণ্য হিসাবে World Court-এ গ্রাহ্য হয়।
ভারত থেকে একটি দল মঙ্গোলিয়ায় পাঠানো হয়েছিল বিভিন্ন কাজের জন্য। এক বিশাল ময়দানে তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠান যখন শেষ পর্যায়ে, তখন দেখা গেল বহু লোক মঞ্চে উঠতে ব্যস্ত। ভারতের প্রতিনিধিরা জানতে চাইলেন গন্ডগোলের কারণ। তারা জানাল, স্থানীয় মানুষের ধারণা, ভারত পবিত্র দেশ। তাদের মস্তক স্পর্শ করলে সৌভাগ্য লাভ হবে। যে আদর্শ, যে ভাবধারা, যে শিক্ষা, যে ত্যাগ-তিতিক্ষা ভারতকে করেছে আদরনীয়, ব্যাস, বশিষ্ঠ, বাল্মীকির যে জীবনধারা ভারতকে করেছে মহান, আমরা সেই দেশে থেকে কী জীবনযাপন করছি! নিজেকে ভারতীয় বলার কতটুকু যোগ্যতা অর্জন করতে পারলাম!
স্ট্যালিনের রাজত্বকাল। ভারত থেকে এক প্রতিনিধিদল গিয়েছিল। এক প্রত্যন্ত গ্রামে সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সভা শেষে ১৫০ বছরের বৃদ্ধ এক ভারতীয় প্রতিনিধিকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেছিলেন, কারণ তিনি কাশীতে থাকেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান চিনের ওপর অনেক বোমা ফেলেছিল। কিছু বোমা বিখ্যাত China wall-এর বেশ কিছুটা ক্ষতিসাধন করে। Great China wall-এর ভগ্নস্তূপে এক লোহার সিন্ধুক পাওয়া যায়। সেই লোহার সিন্ধুকে বৃহৎ আকারের হস্তলিখিত একটি মনুসংহিতা পাওয়া যায়। ভারতের ধারা, কোনও বৃহৎ নির্মাণ করতে গেলে তার তলায় পবিত্র জিনিস রাখা হয়।
একবার এক রাজা মৃগয়া করতে গিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে একরাতের জন্য এক ভিল পরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাজা ভিলকে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে তার জীবন চলে। ‘ভিল বলল, বন থেকে কাঠ নিয়ে এসে পুড়িয়ে কাঠকয়লা বানিয়ে বিক্রি করি।’ ভিল ভাবতেই পারেনি, স্বয়ং রাজা তার বাড়িতে আশ্রয নিয়েছেন। রাজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত পয়সা পাও?’ ভিল বলল, ‘যেদিন যেমন কাঠ পাই। তবে খুব অল্প পয়সা পাই। কোনওমতে সংসার চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আহার জোটে না।’ পরদিন রাজা ফিরে গেলেন। কিছুদিন বাদে রাজা ভিল পরিবারকে এক চন্দন বনে ঘর করিয়ে দিলেন, যাতে চন্দন কাঠ বিক্রি করে সে সুখে জীবন কাটাতে পারে। এক বছর পর ফের ভিলের কাছে গেলেন রাজা। দেখলেন, ভিল খুব খুশি। রাজা বললেন, ‘এখন কেমন আছ?’
– খুব ভালো আছি। এখানে এত কাঠ! রোজ অনেক কয়লা বানাচ্ছি।
রাজা বুঝলেন, ভিল চন্দন কাঠের মূল্য বুঝল না। আমাদের অবস্থা অনুরূপ। ভারতে থাকার সৌভাগ্য হল, কিন্তু তার মূল্য দিতে পারলাম না।
১৯৪০ সালের ডিসেম্বরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সামনে বক্তৃতা প্রসঙ্গে ডা. মেঘনাদ সাহা বলেন, ভারতে যাঁরা উন্নতি করেছেন, তাঁরা কেউ ধর্ম মানেননি। যাঁরা ধর্ম মেনেছেন, তাঁরা কেউ উন্নতি করতে পারেননি।
আমরা এমন শিক্ষক পেয়েছি, তাই ভারতের মর্যাদা দিতে পারলাম না। মেঘনাদ সাহা কি নালন্দা, বল্লভি, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, তক্ষশীলা প্রভৃতি অতীত ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শোনেননি? কশ্যপ, ধর্মরক্ষিতা, বোধিধর্ম, মালানন্দ প্রমুখ শিক্ষকের নাম শোনেননি, যাঁরা ভারতের বাইরে দেশের জ্ঞান বিতরণ করেছেন? ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা যতদিন ধর্মনির্ভর ছিল, ততদিন ভারত বিশ্বকে জ্ঞান বিতরণ করেছে। ভারত যখনই ধর্মকে হেয় করেছে, তখনই সর্বনাশ ডেকে এনেছে, ভিক্ষার ঝুলি হাতে নিয়েছে। বিবেকানন্দের লেখনী এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন, ‘তোমরা কি গঙ্গাকে তাহার উৎপত্তিস্থানে হিমালয়ে ঠেলিয়া লইয়া গিয়া আবার নতুন খাতে প্রবাহিত করতে ইচ্ছে করো? ইহা যদি সম্ভব হয়, তথাপি এই দেশের পক্ষে তাহার জাতিগত বৈশিষ্ট্য ধর্মজীবন পরিত্যাগ করিয়া রাজনীতি বা অপর কিছুকে জাতীয় জীবনের মূল ভিত্তি রূপে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।’
একটি গল্প। হোয়াটসঅ্যাপ থেকে পাওয়া। এক ভদ্রলোকের ১৯টি ঘোড়া ছিল। মৃত্যুর আগে তিনি বলে যান, ১/২ ভাগ ছেলেকে, ১/৪ ভাগ মন্দিরে ও ১/৫ ভাগ ভৃত্যকে দিতে হবে। বহু লোক অনেক চিন্তাভাবনা করেও কোনও সুরাহা করতে পারলেন না। অবশেষে এক মহাত্মাকে ধরা হল। তিনি ঘোড়ায় করে এলেন। বললেন, ১৯টি ঘোড়া লাইন দিয়ে দাঁড় করাও। এবার নিজের ঘোড়া পাশে রাখলেন। মোট ২০টি হল। হিসাব করা সহজ হল। ১০টি ছেলে, ৫টি মন্দির, ৪টি ভৃত্যের ভাগে পড়ল। এবার নিজের ঘোড়া নিয়ে মহাত্মা চলে গেলেন। ঠিক অনুরূপভাবে ভগবানকে সংসারের সদস্য করলে সব সমস্যার সমাধান হবে। ভগবানকে সন্দেহ করে যত দুরে সরাবে, তত সংসার সমস্যাসঙ্কুল হবে।
