সুদীপ ঘোষাল

শরৎশশী তাঁর স্বামী উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের অসুস্থ অবস্থায় সেবা করে চলেছেন দিনরাত। স্বামী উমেশচন্দ্র বলছেন, শশী আমার সংসার তোমার হাতে থাকল। আমি আর বাঁচব না। তুমি সকলকে নিয়ে সাবধানে থেকো। দু’-চারদিনের মধ্যে উমেশচন্দ্র পরলোকগমন করলেন। শরৎশশী কান্নাকাটি করলেন। কিন্তু মানুষের শেষ পরিণতিকে মানতে হয় সকলকে।
চৈতন্যদেবের আমলে কুমারখালির নাম ছিল তুলসীগ্রাম। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এ অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের জন্য কালেক্টর নিযুক্ত করেন কুমারকুলি খাঁকে। তাঁর নাম থেকে আঞ্চলিক সদরের নাম হয় কুমারখালি। সাবেক ‘কমরখালির’ বিবর্তিত রূপ বর্তমানের ‘কুমারখালি’। ছোট থেকেই যতীন্দ্রনাথ গাছে চড়া, সাঁতার কাটায় বাহাদুর ছিলেন। তাঁর জননী শরৎশশী বলতেন, যাও পুকুরে গিয়ে সাঁতার কাটো। নিজের শরীর গঠন করো। শরীর ভালো না থাকলে মন ভালো থাকে না। বন্ধুদের সঙ্গে কবাডি খেলো।যতীন বলতেন, আমি কবাডি খেলতে ভালোবাসি মা।
বিপ্লবী এই বীর জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের মহানায়ক বাঘাযতীনের আসল নাম যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তাঁর জন্ম কুষ্টিয়ার কুমারখালির কয়ায়। বাবার নাম উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম শরৎশশী। খুব ছোটবেলায় যতীন তাঁর বাবাকে হারান। যতীনের মা বিধবা শরৎশশী দেবী ছিলেন স্বভাবকবি। স্বামীর স্বর্গারোহণ, শ্মশান, সংসার প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই বাঘাযতীনকে সাহসী করে তোলার পিছনে তাঁর মা শরৎশশীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। একদিন সকালবেলা যতীন্দ্রনাথ উঠে ব্যায়াম করছেন, এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন প্রতিবেশীরা সকলে মিলে বাঘ বাঘ বলে চিৎকার করছেন। তিনি খালি হাতে বেরিয়ে পড়লেন বাঘ দেখার জন্য। জঙ্গলের আশপাশে বাঘ লুকিয়ে পড়ছে। সহজে দেখা যাচ্ছে না। হাতে একটা ছোরা নিয়ে তিনি দৌড়ে গেলেন ফাঁকা জায়গায়। মানুষের মাঝে বাঘ ধরা বিপজ্জনক। সঙ্গে বন্ধুরাও চারদিক থেকে ঘিরে ধরলেন বাঘকে। তিনি তাঁদের নির্দেশ দিলেন, কে কোন দিকে যাবেন। তারপর শেষে দেখা গেল বাঘের সঙ্গে তাঁর লড়াই শুরু হল। প্রচণ্ড লড়াই। কে জেতে কে হারে? সবাই উদ্বিগ্ন চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। বাঘাযতীনকে মেরে ফেলবে বাঘ! বাঘের থাবার সঙ্গে কি মানুষ পেরে ওঠে? এসব ভাবতে ভাবতে দেখা গেল বাঘটি নীচে মরে পড়ে আছে। যতীন উঠে দাঁড়িয়ে আছেন বাহাদুরের মতো। তবে তিনি ঘায়েল হয়েছেন। আর এদিকে সকলে বাঘাযতীন জিন্দাবাদ বলে সমস্বরে চিৎকার করে জয়ধ্বনি দিচ্ছেন। কোনও অস্ত্রের সাহায্য ছাড়াই খালি হাতে বাঘ হত্যা করার পর তাঁকে বাঘাযতীন নামে অভিহিত করা হয়।
বাঘাযতীন এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করার পর বেঙ্গল গভর্নমেন্টের স্টেনোগ্রাফার নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন নির্ভীকচিত্ত এক যুবক। অচিরেই তিনি একজন আন্তরিক, সৎ, অনুগত এবং পরিশ্রমী কর্মচারী হিসাবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। তাঁর মধ্যে আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবোধ অত্যন্ত দৃঢ় ছিল। অরবিন্দ ঘোষের সংস্পর্শে এসে যতীন শরীর গঠন আখড়ায় গাছে চড়া, সাঁতার কাটা ও বন্দুক ছোড়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যুগান্তর দলে কাজ করার সময় নরেনের (মানবেন্দ্রনাথ রায়) সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং অচিরেই তাঁরা একে অপরের আস্থাভাজন হন। তাঁর বন্ধু ছিলেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, এম এন রায় প্রমুখ।

